
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পূর্ণ তদারকির ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকের আগে জমা দেওয়া একটি আলোচনাপত্রে তিনি এ প্রস্তাব তুলে ধরেন। সেখানে তাঁর বক্তব্য, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থাকার কারণে ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়ছে। পাশাপাশি নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা এবং জবাবদিহির অভাব দেখা দিচ্ছে।
আলোচনাপত্রে তিনি আরও জানান, নির্বাচনের আগে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত বছরের অক্টোবরে দেওয়া ওই প্রতিশ্রুতি এখনো কার্যকর করা হয়নি।
সোনালী ব্যাংকের এমডি নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কার্যক্রমে অসংগতির উদাহরণ হিসেবে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) নিয়োগ ও দায়িত্বে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি জানান, গত ১৯ অক্টোবর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অবশিষ্ট কার্যকাল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে তাঁকে পুনরায় দায়িত্বে বহাল রাখা হয়। তাঁর মতে, এ ঘটনা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অসংগতি প্রকাশ করে।
এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা এনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোর প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। সাউথইস্ট ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জনতা ব্যাংকের এমডি এবং যমুনা ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে অন্য একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি করার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কী যোগ্যতা ও মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, তা পরিষ্কার নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে করার প্রস্তাব দিয়েছেন এই সংসদ সদস্য। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, এ ধরনের পদে অভিজ্ঞ সরকারি ব্যাংকারদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করা উচিত।
ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি
আলোচনাপত্রে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে মোট শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে, জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ছয়টি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের প্রায় ৫১ শতাংশই এই ব্যাংকের।
অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১৯ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) ৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকা।
আলোচনাপত্রে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চের শেষে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপরের তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে।
আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, জনতা ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ জমার পেছনে বেক্সিমকো, এস আলম গ্রুপ, অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানের ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার কারণেই এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের দাবি
আলোচনাপত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকির সম্পূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কার্যকাল এবং তাঁকে অপসারণের প্রক্রিয়া আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, নির্বাহী বিভাগ যেন ইচ্ছামতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম মূল্যায়নে মূল কর্মসম্পাদন সূচক (কেপিআই) প্রবর্তন এবং মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আলাদা করার কথা বলা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের পক্ষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের নীতিমালার কথাও আলোচনাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর মতে, ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে কেবল দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পরিবর্তন করলেই চলবে না। বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে এমন প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ৬ জানুয়ারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আলোচনাপত্রে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলের পক্ষ থেকেও ব্যাংক খাতের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ অবসানের পক্ষে মত দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ব্যাংকারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।