
এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি শেষ করতে বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় থাকার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। একই সময়সীমা পেয়েছে নেপালও। উত্তরণ প্রক্রিয়া টেকসই ও মসৃণ করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করার যুক্তিতে দুই দেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর বাংলাদেশের জন্য বর্ধিত প্রস্তুতিকাল অনুমোদন করা হয়। এর ফলে আপাতত এলডিসি হিসেবে পাওয়া বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বহাল থাকবে। বিশেষ করে রপ্তানি পণ্যে সম্ভাব্য বাড়তি শুল্কের চাপ থেকে স্বস্তি পাবেন দেশের রপ্তানিকারকেরা।
বাংলাদেশের উত্তরণ পেছানোর আবেদনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট—দুই দিকই বিবেচনায় নিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এসব অভিঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও উত্তরণ প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। ইউএনসিডিপির প্রচলিত মূল্যায়ন কাঠামোয় রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সাধারণত প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের জটিলতা ও বিশেষ পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মতে, অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে বাইরের অভিঘাতের প্রভাব বাড়িয়ে দেয় এবং সেগুলো মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।
বর্ধিত সময় কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে বলা হয়েছে। এ কৌশল বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে ইউএনসিডিপিকে বার্ষিক প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
রপ্তানি খাতে স্বস্তি
এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে তাৎক্ষণিক চাপ কমবে। উত্তরণের পর বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আশঙ্কা ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে এলডিসি পরিচয়ের সুবাদে ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্য জোটে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছেন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এ ধরনের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার আওতায় রয়েছে। তাই উত্তরণের প্রস্তুতি শেষ করার পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারসুবিধা ধরে রাখাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তরণের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের যুক্তি, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সংস্কার শেষ না করে এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যেভাবে সময় বাড়ানোর আবেদন
ক্ষমতা গ্রহণের দুই দিনের মাথায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএনসিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইউএনসিডিপির ২৮তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি প্যানেল গঠন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি আরও আলোচনার জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সুপারিশ করে। বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে জি-৭৭ জোটভুক্ত দেশগুলো সমর্থন জানায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) সময় বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি জানিয়েছিলেন, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের আবেদন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।
তিন মানদণ্ডেই উত্তরণের যোগ্যতা
মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (ইভিআই)—এলডিসি থেকে উত্তরণের তিনটি শর্তই পূরণ করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৮ সালের পর ইউএনসিডিপির পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় দেশটি এ যোগ্যতা ধরে রাখে। সে হিসাবে চলতি বছরই বাংলাদেশের এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এর আগে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে প্রস্তুতির জন্য দুই বছর অতিরিক্ত সময় পেয়েছিল দেশটি।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের ২০২৪ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, এলডিসি উত্তরণের জন্য মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বা জিএনআইয়ের ন্যূনতম সীমা ছিল ১ হাজার ৩০৭ ডলার। ওই সময়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৮৪ ডলারে।
একই পর্যালোচনায় মানবসম্পদ সূচকের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় স্কোর নির্ধারণ করা হয় ৫৯ দশমিক ৬। বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৭ দশমিক ৫। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৪০ দশমিক ৬, যেখানে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২১ দশমিক ৯।
এর আগে ২০১৮ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো তিনটি মানদণ্ডেই উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউএনসিডিপির দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় দেশটিকে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের জন্য একটি দেশকে তিনটি মানদণ্ডের অন্তত দুটি পূরণ করতে হয়। তবে প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জনের পর পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনাতেও সেই অবস্থান ধরে রাখতে হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যে তিনটি মানদণ্ডেই উত্তরণের শর্ত পূরণ করেছে।
২০১৯ সালের পর্যালোচনাতেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নির্ধারিত সীমার চেয়ে ভালো। ওই বছর মাথাপিছু জিএনআই ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার, যেখানে উত্তরণের সীমা ছিল ১ হাজার ২২২ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৫ দশমিক ৩, বিপরীতে প্রয়োজনীয় সীমা ছিল ৬৬। আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৭ দশমিক ৩, যেখানে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৩২।
উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ
যোগ্যতা অর্জন করলেও এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বৃহত্তম এলডিসি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হওয়ায় বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া অন্য অনেক দেশের তুলনায় জটিল।
এলডিসি পরিচয় হারালে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগিতা ও সহায়তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট এবং কাঠামোগত দুর্বলতা উত্তরণের প্রস্তুতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
নতুন করে পাওয়া তিন বছর তাই কেবল উত্তরণের তারিখ পেছানোর বিষয় নয়; বরং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো, অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটানো, প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ। এই সময়ের সদ্ব্যবহারই নির্ধারণ করবে এলডিসি-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ কতটা শক্ত অবস্থান নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে।