
পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ পদে পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক ও টানা আন্দোলনের জেরে তীব্র গ্রাহক আস্থার সংকটে পড়েছে বেসরকারি খাতের বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি থেকে মাত্র এক সপ্তাহে সাধারণ গ্রাহকেরা প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি আমানত তুলে নিয়েছেন। এমন চরম নগদ অর্থসংকটের মুখে গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সামাল দিতে মঙ্গলবার (১০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার কোটি টাকা ধারের জন্য আবেদন করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ‘ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ মে থেকে শুরু করে ৭ জুন পর্যন্ত মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ইসলামী ব্যাংকের আমানত কমে গেছে ৪ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। এর পরবর্তী দুই দিনেও আমানত তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকায় উত্তোলনের পরিমাণ আরও বড় অঙ্কে ঠেকেছে।
এই সংকটের সূত্রপাত মূলত পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির ঠিক আগের শেষ কর্মদিবসে, যখন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান হঠাৎ পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলে ব্যাংকটির ভেতরে-বাইরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।
এর পরপরই ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ নামক একটি ব্যানারের অধীনে নতুন চেয়ারম্যানের অপসারণ চেয়ে রাজধানীর দিলকুশায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়। গ্রাহকদের এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘস্থায়ী এই অস্থিরতার কারণে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তারা তড়িঘড়ি করে নিজেদের জমানো টাকা তুলে নিতে শুরু করেন।
আজ মঙ্গলবারও (১০ জুন) টানা নবম দিনের মতো ব্যাংকটির সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের স্পষ্ট অভিযোগ, অতীতে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন ব্যক্তিকে ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে বসানোর কারণে তারা তাদের আমানতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ওমর ফারুক খানকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে পুনরায় বহাল করা, অতীতের লুটপাটের সঙ্গে জড়িত কাউকে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদে স্থান না দেওয়া এবং ব্যাংক রেজোল্যুশন অ্যাক্ট থেকে ১৮ (ক) ধারাটি পুরোপুরি বাতিল করা। এছাড়া এস আলম গ্রুপের অবৈধভাবে দখল করা মালিকানা ও দেশের অভ্যন্তরে থাকা তাদের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাচার হওয়া অর্থের সমন্বয় করার দাবিও জানানো হয়েছে। আন্দোলনকারীরা চান, কেবল ইসলামী ব্যাংকই নয়, এস আলম গ্রুপ যাতে দেশের আর কোনো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরতে না পারে এবং ব্যাংক খাতের সমস্ত লুটেরাদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে শেয়ারবাজার থেকে নামে-বেনামে শেয়ার কিনে, তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ জোরপূর্বক নিজেদের হাতে নিয়েছিল এস আলম গ্রুপ। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি অবশেষে এস আলমের কবল থেকে মুক্ত হয়। এরপর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধিরাই এটি পরিচালনা করছেন। তবে দীর্ঘদিনের লুটপাটের কারণে বর্তমানে ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। এই চরম আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতেই এখন পুনরায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার দ্বারস্থ হতে হয়েছে ব্যাংকটিকে। এর আগেও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছিল।