
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে পড়ে যাওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং আমানত ফেরত নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, শাখা কার্যালয়ে তালা ঝোলানো এবং আইনি জটিলতা ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়েও।
চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের তিনটি শাখায় তার তিন কোটির বেশি টাকা আটকে আছে। গত দেড় বছরে তিনি মাত্র সাত লাখ টাকা তুলতে পেরেছেন। তার ভাষায়, ব্যাংকগুলো প্রতিবারই নতুন অজুহাত দিচ্ছে, কিন্তু আমানতকারীদের ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে গ্রাহকেরা আন্দোলন, স্মারকলিপি ও বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করলেও কার্যকর সমাধান মেলেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা আমানত ফেরতের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদ এলাকায় কয়েকটি শাখা কার্যালয়ে তালাও ঝুলিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ আমানতকারীরা।
সংকট সামাল দিতে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এসআইবিএলকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। ওই সময় ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছিল প্রতিষ্ঠানগুলো।
রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিতে আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে নতুন এই ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয় ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ধরা হয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। একীভূত হওয়ার পর গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পাঁচ মাস পেরিয়ে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। নতুন পুঁজি না আসা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরই মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে সদ্য পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’। বিশেষ করে আইনের ১৮(ক) ধারা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ব্যাংক খাতে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই ধারার মাধ্যমে একীভূত বা রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোতে পুরোনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে উদ্বেগও জানিয়েছে।
একই ধারার সুযোগ নিয়ে সম্মিলিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। গত ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো আবেদনে প্রতিষ্ঠানটি আবারও স্বতন্ত্র শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার আগ্রহ জানায়। বিষয়টি সামনে আসার পর পুরো একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. আহসান হাবীব মনে করেন, শুরু থেকেই একীভূতকরণে সঠিক কৌশল অনুসরণ করা হয়নি। তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, সব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান এক ছিল না। কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯০ শতাংশ, কোথাও ৪০ শতাংশ। ফলে তুলনামূলক কম দুর্বল ব্যাংকগুলো কেন অন্যদের দায় নেবে, সেই প্রশ্ন তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
একই ধরনের মত দিয়েছেন বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। তার মতে, ব্যাংক একীভূতকরণ সাধারণত স্বেচ্ছাভিত্তিক প্রক্রিয়া হলেও এখানে সেটি হয়নি। তার ভাষায়, দুর্বল কয়েকটি ব্যাংককে একসঙ্গে জোর করে একীভূত করায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে পুরো ব্যাংক সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনই এই উদ্যোগ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখছে না। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার কথা বলে আসছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির অবস্থার বড় ধরনের উন্নতি হয়নি। দেশি কিংবা বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারীও এখনো বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শুধু একীভূতকরণের মাধ্যমে সংকট কাটানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও তাগিদ দিয়েছেন তারা।