
নতুন আমদানি নীতির খসড়া অনুযায়ী দেশের বাজারে ৫ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি আমদানি করার সুযোগ রাখা হতে পারে। এছাড়া, এলসি বা ঋণপত্র ছাড়াই বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে পণ্য আমদানি করা আরও সহজ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এলসি ছাড়া পাঁচ লাখ ডলার পর্যন্ত বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি করা সম্ভব। নতুন নীতি অনুযায়ী, অনুমোদিত পণ্য এলসি ছাড়াই যে কোনো পরিমাণে আমদানি করা যাবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে বিদেশি বিক্রেতার সঙ্গে সকল লেনদেনের শর্ত নির্ধারিত থাকে, যদিও অর্থ পাঠানোসহ সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
গত রোববার সচিবালয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তিন বছরের নতুন আমদানি নীতি (২০২৫-২৮) খসড়া নিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কিছু পরিবর্তন প্রবর্তন করে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে আমদানি নীতি যুগোপযোগী করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, "আমদানি নীতি আদেশে পরিবর্তন আনার বিষয়ে এক মাস ধরে আলোচনা চলছে। উদারীকরণ ও সহজীকরণের লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানি-সংক্রান্ত লেনদেনের পদ্ধতি, পণ্যের মান যাচাই এবং অন্যান্য শর্তগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।"
তিনি আরও জানান, "এসব প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে। খুব শিগগিরই, সম্ভব হলে আগামী বৈঠকেই বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।"
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন নীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। "বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্টে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন খসড়া প্রস্তুতির আগে বিভিন্ন চেম্বার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও অ্যাসোসিয়েশনের মতামত নেওয়া হয়েছে। গতকালের বৈঠকে উপদেষ্টা ও সচিব খসড়ার মূল প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করেন। এতে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া হাতে প্রায় ১০ মাস সময় থাকায় নীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হচ্ছে।
বিদ্যমান আমদানি নীতি (২০২১-২৪) এর মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়েছে, তবে নতুন নীতি না জারি হওয়ায় পুরনো নীতিই এখন কার্যকর।
খসড়ায় পরিবেশ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য হাইড্রোলিক হর্ন আমদানিতে বিধিনিষেধ প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী হর্নের শব্দ সর্বোচ্চ ১০০ ডেসিমেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে। এছাড়া পেট্রো কেমিক্যাল শিল্পের কাঁচামাল ইথাইলিন ও প্রোপাইলিন আমদানির সুযোগ প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তবে বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অনুমতি আবশ্যক।
মিথাইল ব্রোমাইডের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় চাল ও মসলা রপ্তানিতে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সমাধানের উদ্যোগও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডার আমদানিতে আলাদা এইচএস কোড নির্ধারণ, পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিং নিশ্চিত করে পুরোনো ব্যাটারি আমদানি এবং পাম অলিন আমদানি ক্ষেত্রে বিএসটিআই সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় সব ধরনের বর্জ্য পদার্থ আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে চিংড়ি, জীবিত শূকর ও শূকরজাত পণ্য, পপি বীজ, পোস্তদানা, ঘাস, ঘন চিনি, কৃত্রিম সরষের তেল, রিকন্ডিশন্ড অফিস ইকুইপমেন্ট, পুরোনো কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী। এছাড়া ৭৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দের হর্ন, ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক, পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন ব্যাগ এবং দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনের থ্রি-হুইলারও নিষিদ্ধ করা হবে।
শর্ত সাপেক্ষে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি, তিন বছরের বেশি পুরোনো ও ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল, সাড়ে ৪ সেন্টিমিটারের কম ব্যাসের কারেন্ট জাল এবং এলএনজি আমদানি করা যাবে। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের মতে, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানে গাড়ির বয়সসীমা শিথিল থাকায় সাধারণ মানুষ কম দামে গাড়ি ব্যবহার করতে পারবে।