
পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২৫ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সৃষ্টি হয়েছে নতুন মাইলফলক। প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং চ্যানেলে এক বছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।
গত বছর প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন মোট ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার। এর আগের বছর ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫৯৩ কোটি ডলার, যা প্রবৃদ্ধির হার হিসেবে ২২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, টানা দ্বিতীয় বছর রেমিট্যান্সে এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বার্ষিক রেকর্ডের পাশাপাশি একক মাস হিসেবেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। ভোটের আগে ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয়বারের মতো রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়িয়েছে। ওই মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩২৩ কোটি ডলার, যা এক মাসে এ যাবৎকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে গত বছরের মার্চে সর্বোচ্চ ৩৩০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল।
তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে প্রবাসীরা পাঠান ২৮৯ কোটি ডলার, আর আগের বছরের ডিসেম্বরে এসেছিল ২৬৪ কোটি ডলার। সাধারণত ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স বাড়লেও এবার রমজানের আগেই এই রেকর্ড গড়া হয়েছে। এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে হুন্ডি কার্যক্রম কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আগে ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন আমদানিতে কম মূল্য দেখিয়ে এলসি খোলা হতো এবং দেশের বাইরে বাকি অর্থ পরিশোধ করা হতো প্রবাসীদের ডলার কিনে পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছে দিয়ে। বর্তমান সরকার অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং আগের পাচার করা অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ জোরদার করেছে।
এ লক্ষ্যে ঋণ জালিয়াতি, রাজস্ব ফাঁকি ও অর্থপাচারসহ নানা অনিয়মে অভিযুক্ত ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবারের অনিয়ম তদন্তে ১১টি যৌথ টিম গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাভেদ পরিবার এবং সালমান রহমান পরিবারের যুক্তরাজ্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ডলার প্রবাহ বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা কিনছে। গত বছর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মোট ৩১৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩০ ডিসেম্বর বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে এই রিজার্ভ গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
উল্লেখ্য, দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল ২০২১ সালের আগস্টে। এরপর ধারাবাহিকভাবে তা কমতে থাকে এবং আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে রিজার্ভ থেকে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল বলে জানা গেছে।