
দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় কারাগারেই থাকতে হচ্ছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে। রোববার (১ নভেম্বর) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন।
আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল হক দিদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রোববার গাজী নজরুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান, মিজানুর রহমানসহ অন্য আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। শুনানিতে আসামিপক্ষের দাবি, গাজী নজরুল ইসলাম নির্দোষ এবং এজাহারে উল্লেখ করা ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তাঁকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইনজীবীরা আদালতকে জানান, গাজী নজরুল ইসলামের বয়স ৭৫ বছর। তিনি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। এ ছাড়া জটিল হৃদরোগে ভুগছেন তিনি। জামিন পেলে তাঁর আত্মগোপন করা কিংবা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই বলেও দাবি করেন তাঁরা। তবে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে। দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেন।
মামলার সূত্রপাত গত ২০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সংসদ সদস্যদের আবাসিক ভবন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী ১৯ বছর বয়সী মোছা. মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। এতে গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, গত জুনে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় এ বিয়ে হয়েছিল বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সংসদ সদস্য হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর দুই স্ত্রীকে নিয়ে ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন।
বাদীর অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের কাছে নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন বলেও এজাহারে বলা হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ইসলাম ফোন করে মরিয়মের বাবাকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি অনেক লোকজনের উপস্থিতি দেখতে পান। পরে জানতে পারেন, একটি কক্ষে তাঁর মেয়ে ওড়না পেঁচিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে রয়েছেন। শেরেবাংলা নগর পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মেয়ের মরদেহ দেখতে পান তিনি। এ সময় বিছানার ওপর মরিয়মের লেখা একটি সুইসাইড নোটও পাওয়া যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর দাবি, আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং তাঁদের প্ররোচনায় মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন।
মামলায় গ্রেপ্তারের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের এক দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ২২ সেপ্টেম্বর মাকসুদা ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়। একই মামলায় গ্রেপ্তার মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকেও ২৩ সেপ্টেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়।
অন্যদিকে, চার দিনের রিমান্ড শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুল ইসলামকে আরও চার দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালত মাকসুদা ইসলামকে জামিন দেন।
এর আগে গত জুলাইয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকেও জানানো হয়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ২১ জুলাই আরেকটি মামলাও হয়। অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলামের গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান পল্লবী থানায় মামলাটি করেন। ওই মামলায় গত ১০ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের জামিন পান গাজী নজরুল ইসলাম। তবে পরবর্তী সময়ে মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তাঁর বাবার করা মামলায় ওবায়দুর রহমানকেও আসামি করা হয়।