 জিয়াউল আহসান.webp)
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে সেটিকে আইনগতভাবে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রশাসনিক তদন্তের নামে একটি নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া চালানো হতো বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হতো। জিয়াউলের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর একক বেঞ্চে বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর সামনে নিজের জবানবন্দি দেন রফিকুল ইসলাম। এদিন তাকে মামলার ১৫তম সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
‘প্রকৃত অপরাধীদের আড়ালেই রাখতে প্রশাসনিক তদন্ত’
জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জনসমক্ষে চলে এলে সেটিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য লোক দেখানো প্রশাসনিক নির্বাহী তদন্ত পরিচালনা করা হতো। এসব তদন্ত ছিল নিয়ন্ত্রিত এবং এর মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আড়ালে রাখার ব্যবস্থা করা হতো।
তিনি আরও বলেন, তদন্তের নামে এমন প্রতিবেদন তৈরি করা হতো, যাতে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ প্রকাশ না পায়। এ উদ্দেশ্যে কর্মকর্তাদের ভুল ও মিথ্যা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং পুলিশ প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বাধ্য করা হতো বলে দাবি করেন তিনি।
রফিকুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অপরাধীদের দায় থেকে রক্ষা করা।
তৃতীয় দিনের মতো তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর রফিকুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওইদিন তিনি আংশিক জবানবন্দি দেন। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি কোথায় কোথায় গেছেন, কী ধরনের তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলো মামলার অভিযোগের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত—জবানবন্দিতে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার তার সাক্ষ্যগ্রহণ তৃতীয় দিনের মতো শেষ হয়। তবে তার সাক্ষ্যগ্রহণের বাকি অংশের জন্য আগামী রোববার (১১ অক্টোবর) দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর মামলায় সাক্ষ্য দেন কামরুল ইসলাম। তদন্তের সময় বিভিন্ন স্থান থেকে জব্দ করা আলামত ও সেগুলোর তথ্য তিনি ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করেন। একই দিনে মামলার ১৩তম সাক্ষী ও র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমানের জেরা শেষ হয়। তিনি মামলার সর্বশেষ চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলেন।
তিন অভিযোগে শতাধিক হত্যার অভিযোগ
মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মোট তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে সজলসহ তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ওই হত্যাকাণ্ডের সময় জিয়াউল সেখানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন।
দ্বিতীয় অভিযোগের সময়কাল ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল। এই সময়ে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালসংলগ্ন বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগেও একই সময়কালে আরও ৫০ জনকে হত্যার কথা বলা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে বরগুনার বলেশ্বর নদী এবং বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় মাসুদসহ ওই ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।
এসব ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় এবং একই দিন প্রসিকিউশন তার বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল করে।