
ভোলার অতিরিক্ত জেলা জজ এনায়েত উল্ল্যাহর বিরুদ্ধে বিচারিক অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে রায় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন দৈনিক নতুন কাগজের সম্পাদক মোঃ জিয়াউর রহমান।
আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের কাছে দেওয়া এক লিখিত আবেদনে তিনি অভিযোগগুলোর তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, শুনানির কার্যবিবরণী এবং রায় প্রদানের প্রক্রিয়া পর্যালোচনার আবেদন জানিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের বাবা আব্দুল মোতালেব ১৯৯৭ সালে আব্দুল রাজ্জাকের সঙ্গে একটি জমি ক্রয়-সংক্রান্ত অনিবন্ধিত স্ট্যাম্পে চুক্তি করেন। চুক্তির ভিত্তিতে জমির দখল বুঝে নেওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে তারা ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে জমির দলিল সম্পাদনে আব্দুল রাজ্জাকের কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ায় ২০০০ সালে ভোলার সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতে মামলা করা হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ২০১০ ও ২০১১ সালে আব্দুল রাজ্জাক ওই বিরোধীয় জমি জাহাঙ্গীর তালুকদার ও তাঁর স্ত্রীর নামে সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর করেন। বাদীপক্ষের দাবি, মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয়টি প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মামলাটি পর্যাপ্ত শুনানি ও যুক্তিতর্কের সুযোগ না দিয়েই খারিজ করা হয়। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে জেলা জজ আদালতে আপিল করা হয়। মামলাটির নম্বর দেং আঃ ৫৬/১৯। কয়েকজন অতিরিক্ত জেলা জজের আদালতে মামলাটি শুনানির পর বিচারিক দায়িত্ব পান ভোলার অতিরিক্ত জেলা জজ এনায়েত উল্ল্যাহ।
আবেদনকারীর অভিযোগ, এনায়েত উল্ল্যাহ দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলাটির শুনানি কার্যকরভাবে সম্পন্ন না করেই একাধিকবার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। বিভিন্ন সময়ে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী সময়ের আবেদন করলেও বাদীপক্ষ শুনানির জন্য প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও শুনানি গ্রহণ না করে রায়ের তারিখ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, সর্বশেষ ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাদীপক্ষের আইনজীবী শুনানির সুযোগ আদায় করে মামলাটির শুনানি সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯ আগস্ট রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও ওই দিন রায় ঘোষণা করা হয়নি। পরবর্তীতে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, ১৯ জুলাই শুনানি শেষে বিচারক প্রকাশ্য আদালতে বিবাদীপক্ষের আইনজীবীকে বাদীপক্ষের সঙ্গে আপস-মীমাংসার পরামর্শ দেন এবং তা না হলে মামলাটি দীর্ঘদিন চলবে বলে মন্তব্য করেন। আবেদনকারী দাবি করেছেন, এ ধরনের বক্তব্য ও রায় ঘোষণায় দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, মূল বিবাদী আব্দুল রাজ্জাক দীর্ঘদিন মামলাটি পরিচালনা করেননি। পরবর্তীতে তাঁর কাছ থেকে জমি হস্তান্তর নেওয়া জাহাঙ্গীর তালুকদার বিবাদীপক্ষের হয়ে মামলাটি পরিচালনা করে আসছিলেন বলে আবেদনকারীর দাবি।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে আবেদনকারী উল্লেখ করেছেন, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রায় ঘোষণার আগে বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়ে বিচারকের পিয়নের মাধ্যমে বিবাদীপক্ষের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে এবং এর ভিত্তিতে বিবাদীপক্ষের অনুকূলে রায় দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের কাছে অভিযোগ রয়েছে। তবে আবেদনে এ অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আবেদনকারী নিজেই অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া অভিযোগপত্রে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে মামলাটিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও আনা হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের পালকপুত্র মাইনুল হোসেন বিপ্লবের ফোনের মাধ্যমে মামলার বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল বলে আবেদনকারী দাবি করেছেন। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
আবেদনকারী আরও দাবি করেছেন, ২০১৮ সালে মূল মামলাটি খারিজের পর তাঁদের দখলে থাকা জমি দখলের চেষ্টা হলে স্থানীয় পর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তাঁর বড় ভাই জহির মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং চিকিৎসার জন্য প্রথমে ভোলা সদর হাসপাতাল, পরে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর মাথায় ২৭টি সেলাই দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের অংশ হিসেবে মামলার সম্পূর্ণ নথি, আদালতের আদেশ, শুনানির কার্যবিবরণী, রায় প্রদানের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে আদালত ও সংশ্লিষ্ট স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত পরীক্ষা করারও আবেদন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালে মূল দেওয়ানি মামলাটি খারিজের সময় যথাযথ শুনানি ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির হস্তক্ষেপে বিচারিক কার্যক্রম প্রভাবিত হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনকারী তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিচারিক আচরণবিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাঁর বাবার দীর্ঘদিনের মামলায় আইনানুগ ও নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগে উত্থাপিত অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতিত্বের বিষয়গুলো এখনো তদন্তসাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট বিচারক, আদালত বা অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে।