
বিএনপি সরকার ক্রসফায়ারের পথে হাঁটলে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত নিজেদের দলের নেতাকর্মীদেরই এর মুখোমুখি হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় যশোর শহরের মুড়লি মোড়ে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের পথসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিএনপি সরকারের উদ্দেশে হাসনাত বলেন, ক্রসফায়ার কার্যকর করতে হলে যাঁরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় করেন, চাকরি দেওয়ার নামে ঘুষ নেন এবং টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁর দাবি, এসব অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে পুলিশ যদি ক্রসফায়ার দিতে শুরু করে, তাহলে বিএনপির নিজেদের লোকজনই এর শিকার হবেন।
তিনি বলেন, বিএনপির প্রত্যেক নেতাকর্মী চাঁদাবাজ নন, এটি যেমন সত্য, তেমনি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বিএনপির লোক—এ কথাও সত্য।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা বলেন, তারেক রহমানকে এমন একটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যার অবকাঠামোগত অবস্থা ভালো নয়। তাঁর ভাষায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রীয় গাড়িটির ইঞ্জিন নষ্ট করে দিয়ে গেছে। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।
দেশে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাসনাত বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কথা বললেও মানুষকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এমনকি সরকারের সমালোচনা বা প্রতিবাদ করলেই পুলিশ দিয়ে কাউকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠছে।
এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহের সাথী আক্তার নামে এক নারীর ঘটনার উল্লেখ করেন তিনি। হাসনাতের অভিযোগ, ওই নারী বিএনপিকে ভোট দিয়ে ভুল করেছেন এবং দলটিকে ভোট দেওয়া তাঁর উচিত হয়নি—এমন বক্তব্য ফেসবুক লাইভে দেওয়ার পর পুলিশ তাঁকে বাসা থেকে আটক করে নিয়ে যায়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রতিবাদকারীদের ভয় দেখাতে পুলিশের পক্ষ থেকে ক্রসফায়ারের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, এমনকি পুলিশের মহাপরিদর্শকও (আইজিপি) প্রতিবাদকারীদের ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়েছেন।
কর্মসংস্থানের অভাব নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন হাসনাত। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেও তরুণদের চাকরির জন্য এক দরজা থেকে অন্য দরজায় ঘুরতে হচ্ছে। অথচ কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
জাপান সফর থেকে ফিরে সরকার এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ার তথ্য প্রচার করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাপান সরকার এমন কোনো চুক্তি হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে বলে দাবি করেন হাসনাত।
মালয়েশিয়া সফরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ তাঁর। হাসনাত বলেন, সেখান থেকে ফিরে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের কথা জানানো হলেও মালয়েশিয়া সরকার এ ধরনের কোনো চুক্তির কথা স্বীকার করেনি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের প্রধান চাওয়া হলো খাদ্য, কর্মসংস্থান ও নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। বিএনপি সরকারের প্রতি এসব মৌলিক চাহিদা পূরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের জন্য কাজ না করলে জনগণ আবারও রাজপথে নেমে আসবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগও তোলেন এই সংসদ সদস্য। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনের আগে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
তিনি অভিযোগ করেন, সোনালী, রূপালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। অথচ ঋণখেলাপি ও অনিয়মের কারণে সংকটে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধারে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার আগে নিজের পরিকল্পনা থাকার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দলের অভ্যন্তরেই সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নেতার হাতে কর্মী, সংসদ সদস্যের ছেলের হাতে কর্মী এবং একই দলের নেতাকর্মীদের হাতে নিজেদের দলের লোকজন হত্যার শিকার হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে চান না তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল দেশ পুনর্গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কার্যকর পরিকল্পনা। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি সরকারের কর্মকাণ্ডে তেমন কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।