
ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা নাটোরের গুরুদাসপুরের এক প্রধান শিক্ষক উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তির পর স্থানীয়দের নিয়ে সমাবেশ করেছেন। সেখানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ‘নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার হবে’ বলে হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর ওই বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তির পর নাজিরপুর এলাকায় কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে ওই সমাবেশ করেন নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ (৪৮)। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি।
সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ফিরোজ বলেন, ‘এই যে আমাকে সাজা দিল। দুর্নীতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আপনাদের ধারণা আছে? আমার বিরুদ্ধে মামলা দিল। চারজনের সাক্ষীতে যদি আমাকে যাবজ্জীবন জেল দেয়, তাহলে এখানে কয়েক হাজার লোক আছে এরা তো সবাই সাক্ষী দিচ্ছে প্রতিপক্ষরা কী করেছে। বিচার হবে। বিচার কিন্তু শুরু হয়েছে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি এই নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার হবে।’
তবে কাকে উদ্দেশ্য করে তিনি এ বক্তব্য দিয়েছেন, তা বক্তব্যে স্পষ্ট করেননি। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবারকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, ‘ফিরোজুল ইসলাম জামিনে এসেই আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার করার হুমকিও দিয়েছেন। আমি পরিবার নিয়ে আতঙ্কে বসবাস করছেন। বিষয়টি আমি থানাতেও জানিয়েছি।’
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাজশাহী কারাগারের মূল ফটক থেকে দুই শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে ফুলের মালা দিয়ে ফিরোজকে বরণ করেন তাঁর সমর্থকেরা। পরে রাতে নাজিরপুর এলাকায় সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
মামলার নথি ও রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে এলে বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে থেকে ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রধান শিক্ষক ফিরোজের বিরুদ্ধে। পরে তাঁকে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল বলেও মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পরে ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে ফিরোজ ও তাঁর দুই ভাইকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় মামলা করেন। ১১ অক্টোবর রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তকীতলার একটি আবাসিক হোটেল থেকে তৎকালীন র্যাব-৫-এর সদস্যরা ফিরোজকে গ্রেপ্তার করেন।
রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মলহিদুজ্জামান মুহিত ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করেন। সরকারি কৌঁশলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও ধর্ষণের ভিডিওর ভিত্তিতে ফিরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ধর্ষণের ধারায় তাঁকে যাবজ্জীবন এবং অপহরণের ঘটনায় পৃথক ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মামলার অপর দুই আসামিকে খালাস দেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের এই কৌঁশলি জানান, রায়ের আগে ২৭ নভেম্বর ধার্য তারিখে হাজিরা দিতে গেলে আদালত ফিরোজের জামিন বাতিল করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে রায় ঘোষণার সময় তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়।
ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা বলেন, মামলা হওয়ার পর থেকে রায় পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ফিরোজ লোকজন নিয়ে তাঁদের হুমকি দিয়েছেন এবং অর্থের বিনিময়ে আপস করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। মেয়ের সম্মানের কথা বিবেচনা করে তাঁরা মামলা চালিয়ে গেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁরা সন্তুষ্ট ছিলেন। তবে প্রায় ১১ মাস কারাভোগের পর আপিল করে জামিনে মুক্ত হয়ে ফিরোজ তাঁদের আবারও হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলেও জানান।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্য এবং মামলার বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ফিরোজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, ধর্ষণ মামলার বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং অভিযোগের সত্যতা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।