
কয়েক দিন স্বস্তির পর আবারও তীব্র গ্যাস-সংকটে পড়েছে চট্টগ্রাম। বুধবার সকাল থেকেই নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে বা সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দেখা দিয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার সারি। গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের।
নগরের হালিশহরের বাসিন্দা শারমিন আক্তারের সকাল কেটেছে রান্না ছাড়াই। সকাল আটটার পর থেকে চুলায় গ্যাস না থাকায় দুপুর পর্যন্ত রান্না করতে পারেননি তিনি। শারমিন আক্তার বলেন, ‘সকাল থেকে গ্যাস নেই। দুপুরের রান্নাও করতে পারিনি। হঠাৎ আবার এভাবে গ্যাস চলে যাওয়ায় খুব সমস্যায় পড়েছি।’
গ্যাসের এই সংকট শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই। নগরের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। চালকদের অনেকে জানিয়েছেন, বেশির ভাগ স্টেশনেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব স্টেশনে সরবরাহ রয়েছে, সেখানেও চাপ কম থাকায় গ্যাস নিতে অনেক বেশি সময় লাগছে।
সকাল ৭টায় ষোলোশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়ান সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ নোমান। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তিনি গ্যাস পাননি। জানান, টাইগারপাসসহ নগরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে গিয়েও গ্যাসের সন্ধান পাননি। ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ থাকলেও চাপ কম হওয়ায় দীর্ঘ সময় লাগছে। সেখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন সারিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত থেকে চট্টগ্রামে হঠাৎ গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। বুধবার সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। বিপরীতে চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ায় আটকে এলএনজিবাহী জাহাজ
এবারের গ্যাস-সংকটের কারণ আগেরবারের মতো টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি নয়। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লারের সমস্যার কারণে আগের সংকট তৈরি হলেও এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সরবরাহ কমেছে।
কয়েক দিন আগেও একই সংকটে চট্টগ্রামের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলেন চালকেরা। কেউ কেউ গাড়িতেই রাত কাটিয়েছেন। চার থেকে আট ঘণ্টা লাইনে থেকেও অনেকে গ্যাস পাননি। পরে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয় এবং ফিলিং স্টেশনগুলোর দীর্ঘ সারিও কমে আসে।
তবে সেই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মঙ্গলবার রাত থেকে সরবরাহ ফের কমে যাওয়ায় বুধবার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে আবারও গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কম চাপের কারণে প্রতিটি গাড়িতে গ্যাস ভরতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। এর প্রভাব পড়েছে নগরের বাসাবাড়িতেও।
বাতাসের গতি ৩৮ নট, জাহাজ ভেড়ানো যাচ্ছে না
নতুন করে সংকট তৈরির কারণ ব্যাখ্যা করে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. শোয়েব বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ মহেশখালীর টার্মিনালে ভিড়তে পারছে না। নিরাপদে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতির নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। বর্তমানে বাতাসের গতি সেই সীমার চেয়ে বেশি।
মো. শোয়েব বলেন, জাহাজ টার্মিনালে ভেড়াতে বাতাসের গতি ২০ নটের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট। ফলে নিরাপত্তার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, বর্তমানে মহেশখালীর টার্মিনালগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৪০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভিড়তে পারলে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৭৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।
আগের সংকটও ছিল এলএনজি টার্মিনালকেন্দ্রিক
এর আগে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের বয়লারে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দীর্ঘ সময় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। পরে একটি বয়লার চালু করে সীমিত পরিসরে সরবরাহ শুরু করা হয়।
বর্তমান সংকটের জন্য ওই বয়লারের সমস্যাকে দায়ী করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মো. শোয়েব। তাঁর ভাষ্য, নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে ভেড়ানোর পর গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। এরপর বাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে।
আমদানি করা এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দুই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন মিলিয়ে প্রায় ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
গত ২১ জুলাই একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামে। একপর্যায়ে নগরীতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। পরে টার্মিনালের একটি বয়লার চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। এবারও চট্টগ্রামে সরবরাহ প্রায় একই পর্যায়ে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সংকট কত দ্রুত কাটবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মহেশখালীর আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর। বাতাসের গতি কমে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে নিরাপদে ভিড়তে পারলেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত চট্টগ্রামকে দৈনিক চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি নিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।