
শরীয়তপুর পৌরসভা এলাকায় দেনা-পাওনার বিরোধকে কেন্দ্র করে এক লিবিয়া প্রবাসীর স্ত্রীকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ওই নারীকে প্রকাশ্য দিবালোকে মারধর করার পর মাথার চুল কেটে, মুখে কালি লেপে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে রাস্তার পাশের একটি বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
আজ শনিবার (১৩ জুন) বেলা ১১টার দিকে শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর পালং এলাকায় এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্যাতিত নারীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছে।
শরীয়তপুর সদরের পালং মডেল থানা ও স্থানীয় একাধিক সূত্র মারফত জানা যায়, শরীয়তপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর পালং এলাকার বাসিন্দা টুটুল সরদার বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। তাঁর স্ত্রী মলি বেগম (৩৭) সন্তানদের নিয়ে উত্তর পালং এলাকার নিজস্ব বাড়িতে থাকেন। একই এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার কোটারির পরিবারসহ স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে মলি বেগম বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু টাকা ধার দিয়েছিলেন। সেই ধারের টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে দেলোয়ারের পরিবারের সাথে মলি বেগমের চরম বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে শনিবার সকালে দেলোয়ারের স্ত্রী ও মেয়ে উত্তর পালং এলাকার শাবনুর মার্কেটের সামনে মলি বেগমকে একা পেয়ে আটকে রাখেন। পরবর্তীতে স্থানীয় কয়েকজন নারীকে সাথে নিয়ে তাঁরা মলিকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন এবং জোরপূর্বক তাঁর মাথার চুল কেটে মুখে কালি মেখে দেন। এখানেই শেষ নয়, এরপর মলি বেগমের গলায় জুতার মালা পরিয়ে তাকে পালং-প্রেমতলা সড়কের পাশে একটি বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়।
এমন অমানবিক দৃশ্য দেখে স্থানীয় এক বাসিন্দা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ ফোন করে বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে পালং মডেল থানা পুলিশের একটি দল দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে নির্যাতিত নারীকে উদ্ধার করে। বর্তমানে আহত মলি বেগম শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মারধরের শিকার মলি বেগম ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন:
"আমার সাথে দেলোয়ার কোটারির টাকা-পয়সার লেনদেন আছে। ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করে সে টাকা নিয়েছেন। তার কাছে টাকা চাইলেই তিনি তালবাহানা করছিলেন। এক সপ্তাহ আগে আমি টাকার জন্য চাপ দিয়েছি। এরপর আমি সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় চলে যাই। ঢাকার থেকে ফিরলেই দেলোয়ারের স্ত্রী ও মেয়ে স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে আমাকে মারধর করেছেন। তারা মাথার চুল কেটে, মুখে কালি মেখে আমাকে বেঁধে রেখেছে। আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করব।"
অন্যদিকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দেলোয়ার কোটারির মেয়ে মৌসুমি আক্তার পাল্টা দাবি করে বলেন:
"মলি বেগম আমার বাবাকে উত্ত্যক্ত করত। সে আমার বাবা-মায়ের সংসারে নানা ভাবে ঝামেলা সৃষ্টি করেছে। তিনি এলাকায় মাদক বিক্রি করেন। আজ মাদক বিক্রি করার সময় তাকে স্থানীয় কয়েকজন নারী হাতেনাতে ধরে ফেলে। এরপর ক্ষুব্ধ এলাকার মানুষ তাকে মারধর করে পুলিশে দিয়েছে। আমাদের কাছে সে কোনো টাকা পাবেন না। এখন তার অপকর্ম আড়াল করতে টাকা পাওয়ার মিথ্যা কথা বলছেন।"
পুরো ঘটনার আইনগত পরিস্থিতি নিয়ে পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন:
"মলি বেগম নামের এক নারীর সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন নারীর টাকা পাওনা নিয়ে ঝামেলা চলছিল। এর জের ধরে কয়েকজন নারী মিলে মলি বেগমকে মারধর করে খুটির সাথে বেঁধে রাখেন। স্থানীয়রা জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে ঘটনা জানালে পুলিশ তাকে উদ্ধার করেছে। ওই নারী কিছুটা অসুস্থ হয়ে পরলে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওই নারী আইনগত পদক্ষেপ নিতে চাইলে আমরা সহায়তা করব।"