
আসন্ন কোরবানির ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের জন্য ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কটি স্বস্তিদায়ক হবে নাকি ভোগান্তির কারণ হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় সংশয়। সেতুর অতিরিক্ত ধারণক্ষমতার গাড়ি চলাচল, এলেঙ্গায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কাজ, ফিটনেসবিহীন যান এবং সম্ভাব্য বৃষ্টির কারণে এবারও উত্তরবঙ্গগামী এই প্রধান সড়কে তীব্র যানজটের আশঙ্কা করছেন যাত্রী ও চালকেরা।
ভুক্তিভোগীদের আশঙ্কা, বিগত বছরগুলোর মতো এবারও তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। তবে এই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ, টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ এবং সাসেক-২ প্রকল্পের কর্মকর্তারা।
সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ২৩টি জেলার কয়েক কোটি মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম এই মহাসড়কটি। উৎসবের দিনগুলোতে এই রুটে গাড়ির সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। বিগত ঈদুল আজহায় মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এই সেতু দিয়ে রেকর্ড ৬৪ হাজারেরও বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করতে মহাসড়কের মির্জাপুর থেকে যমুনা সেতুর পূর্ব টোলপ্লাজা পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, ঘরমুখী মানুষের যাত্রা সহজ করতে সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা তড়িঘড়ি করে রাস্তার খানাখন্দ মেরামত, সড়ক প্রশস্তকরণ এবং লেনের মার্কিং করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পূর্বপাড় পর্যন্ত চার লেনের কাজ বারবার সময় বাড়িয়েও শেষ না হওয়ায় এবং এলেঙ্গায় ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলমান থাকায় এখনই স্বাভাবিক যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটছে।
রুটটিতে নিয়মিত যাতায়াত করা বগুড়াগামী জেনিন পরিবহণের চালক আবুল কাশেম নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, "গত রোজার ঈদে চন্দ্রা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত যেতে সময় লেগেছে ১৫ ঘণ্টার বেশি। এবার গরুর ট্রাক চলায় যানজটে আরও বেশি ভোগান্তি হতে পারে। এছাড়া বৃষ্টিতেও ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ হবে।"
একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে সিরাজগঞ্জগামী মাইক্রোবাসের চালক চান মিয়া বলেন, "এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে এখনই যানজট লেগে থাকে। আধা মিনিটের সড়ক যেতে লাগে অন্তত ১৫ মিনিট। পুলিশ চালকদের মামলার নামে হয়রানি করলেও যানজট নিরসনে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না। ঈদে এই ভোগান্তি আরও বাড়বে কয়েকগুণ।"
তবে বড় যানবাহনের চেয়ে ছোট ও ত্রুটিপূর্ণ গাড়িগুলোকে দায়ী করে হানিফ পরিবহণের বাস চালক গোপাল সিকদার বলেন, "বড় গাড়ির কারণে কখনো যানজট হয় না। ফিটনেসবিহীন ছোট মাঝারি যানবাহনের চালকরা এলোমেলো গাড়ি চালানোর কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও ওই সব যানবাহনের চালক ও হেলপাররা যত্রতত্র যাত্রী ওঠা নামানোর কারণেও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।"
এদিকে উন্নয়ন কাজের কারণে ভোগান্তি হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন সাসেক-২ প্রকল্পের টাঙ্গাইল অংশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেডের প্রজেক্ট ম্যানেজার রবিউল আওয়াল। তিনি বলেন, "ঈদ উপলক্ষে ২৪ মের পর উন্নয়ন কাজ বন্ধ থাকবে। এলেঙ্গায় ফ্লাইওভারের কাজসহ বিভিন্ন এলাকায় কাজ চলমান থাকলেও কোনো ভোগান্তি হবে না। যতটুকু সড়ক দখল করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি প্রশস্ত করা হয়েছে।"
আসন্ন ঈদের চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি নিয়ে যমুনা সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, "গত ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বিকলসহ ৭ দিনে ৯১টি ঘটনার কারণে বেগ পোহাতে হয়েছে। আসন্ন ঈদে গরুবাহী যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়াসহ নানা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হয়েছে। উভয়পাশে আলাদা মোটরসাইলেকের লেনসহ ১৮টি বুথে টোল আদায় করা হবে।"
আইনশৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, "ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ফিটনেসবিহীন যান চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যমুনা সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ৬৫ কিলোমিটার মহাসড়কে আট শতাধিক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।"