
শ্রম আইন লঙ্ঘন করে স্থায়ী কাজে ঠিকাদারি শ্রমিক নিয়োগ বাতিল করে ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও অফিস স্টাফদের ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশের স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগসহ ৪ দাবিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান ও মানববন্ধন করেছে প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকরা। আজ রবিবার (৩০ আগস্ট) সকালে বিএটিবি’র ফিল্ড টেকনিশিয়ান এবং অফিস স্টাফ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের উদ্যোগে রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনের সামনে এক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে মন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন তারা।
মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করতে গেলে মন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন দুই শতাধিক শ্রমিক। তাদের ৪ দাবি হলো, ফিল্ড টেকনিশিয়ান পদকে বিএটি বাংলাদেশের স্থায়ী ও মূল কাজের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা; দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ফিল্ড টেকনিশিয়ানদের অবিলম্বে বিএটিবির স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া; শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করা; এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হস্তক্ষেপ করা।
বিএটিবিতে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে শ্রম ভবনের সামনের সড়কে দুই ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ফরহাদ সিদ্দিকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন আন্দোলনকারী ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও অফিস স্টাফদের প্রতিনিধিরা।
এ সময় বিএটিবি’র ফিল্ড টেকনিশিয়ান এবং অফিস স্টাফ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের সভাপতি আরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা ২০১০ সাল থেকে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বছরব্যাপী ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানিতে স্থায়ী ধরনের কাজ করে আসছি। অর্থাৎ বিএটির তামাক চাষি নির্বাচন, চাষির সঙ্গে এগ্রিমেন্ট, বীজ বিতরণ, বীজতলা প্রস্তুতকরণ, চারার পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ, চাষিদের সার ও কীটনাশক বিতরণ, নগদ টাকা ঋণের মাধ্যমে বিতরণ, তামাক রোপণ, পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ, বার্ন ও শেড তৈরি, কোম্পানির বিভিন্ন অ্যাপস (বিজয় অ্যাপস, ব্যাটলাইফ অ্যাপস, এগ্রি ৩৬০)-এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ, তামাকের মাঠে দিকনির্দেশনা, তামাক পাতা সংগ্রহ, কিউরিং, গ্রেডিং, বেল প্রস্তুতকরণ ও পর্যবেক্ষণ, পরিবহন, টিপি ইস্যু এবং লোন পরিশোধ, তামাক কোম্পানির গোডাউন পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছি।
তিনি আরও বলেন, বছরের বাকি দুই মাস আমরা পরিবেশ ও জলবায়ু সংরক্ষণে সবুজ সার ও চাষিদের গাছের চারা বিতরণ এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালন করে আসছি। যা থেকে কোম্পানিটি প্রচুর মুনাফা এবং সরকারের নিকট থেকে বছরের পর বছর সুনাম কুড়িয়ে আসছে। কিন্তু আমরা সারা বছর বিএটিতে স্থায়ী ধরনের কাজ করার পরও তারা আমাদের সরাসরি নিয়োগ না দিয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে আসছে। এটি বিদ্যমান শ্রম আইনের চরম লঙ্ঘন। কারণ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, বছরে ১৮০ দিনের বেশি কাজে ঠিকাদার, আউটসোর্সিং বা থার্ডপার্টি শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ নেই। অথচ বহুজাতিক এ সিগারেট কোম্পানি শ্রমিকদের মুনাফার লভ্যাংশসহ ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করতে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও অফিস স্টাফদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম’এস এম লজিস্টিকস (প্রাঃ) লিমিটেডের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে আসছে, যা শ্রম আইনের লঙ্ঘন।
ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সামিউল ইসলাম বলেন, আমরা ফিল্ড টেকনিশিয়ানসহ যে পদগুলোতে নিরলসভাবে কাজ করছি, সেখানে আগে কোম্পানি কর্তৃক স্থায়ী জনবল ছিল। কিন্তু বহুজাতিক এই কোম্পানিটি তাদের কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আমাদের স্থায়ী পদগুলোকে ঠিকাদারি বা আউটসোর্সিং প্রথার আওতায় নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে বিগত ১৬ বছর ধরে আমাদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা, শ্রম আইন অনুযায়ী বাৎসরিক ৫% লভ্যাংশ এবং চাকরির ন্যূনতম নিরাপত্তা থেকেও বঞ্চিত করছে।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় বিএটিবি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম’এস এম লজিস্টিকস (প্রাঃ) লিমিটেডের চরম শ্রমিক নিপীড়ন ও আইনি চাতুর্যের খতিয়ান আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে কুষ্টিয়া, রংপুর, লালমনিরহাট, চট্টগ্রাম, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় সমবেত হয়েছি। বিএটিবির প্রতিটি রিজিওনের রিজিওনাল ম্যানেজার বরাবর লিখিত আবেদন দিয়েছি গত ৭ জুন ২০২৬। একইসঙ্গে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নে স্থানীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সংস্থাটির মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত সচিব) মোঃ ফরহাদ সিদ্দিক মহোদয়ের কাছে ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে আমরা লিখিত আবেদন জমা দিয়েছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমাদের দাবি বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি না থাকায় আমরা ঢাকায় এসে প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি প্রদানে বাধ্য হয়েছি।
এসময় তিনি আরও বলেন, চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য কুষ্টিয়ায় আল্লারদগা লীফ রিজিওনে ২১ জুলাই এবং রংপুর লীফ রিজিওনে ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছি। আমাদের আইনি আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ০৩ আগস্ট ২০২৬ ইং তারিখে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত শুনানিতে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়ের উপস্থিতিতে বিএটিবি’র ডিএলএম ও আরএম এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ তাদের আইনজীবী এবং এম’এস এম লজিস্টিকস (প্রাঃ) লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টর উপস্থিত ছিলেন। শুনানিতে আমাদের অকাট্য আইনি যুক্তির সামনে কোণঠাসা হয়ে মালিকপক্ষ শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে এবং মুখে বলেছে ‘আইনে যদি সুযোগ থাকে বা শ্রমিকরা আইনে পায়, তবে আমাদের কোম্পানি তাদের স্থায়ী করবে। কিন্তু তারা আজও দাবি বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানিমূলক বদলিসহ নানা ধরনের হুমকি দিয়ে আসছে।
রবিবার সকালে শ্রম ভবনে স্মারকলিপি প্রদান শেষে মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের সামনে অবস্থান করেন করে বিএটিবি ফিল্ড টেকনিশিয়ান এবং অফিস স্টাফ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের দুই শতাধিক শ্রমিক। পরে সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বরাবর স্মারকলিপি দেন বিএটিবি’র ফিল্ড টেকনিশিয়ান এবং অফিস স্টাফ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ।