
ফ্যাশন ডিজাইনার মানেই কি শুধু কোটি টাকার রাজকীয় কাপড় আর চাকচিক্য? প্রচলিত এই ধারণাকে এক নিমেষেই বদলে দিয়েছেন নাইজেরিয়ার খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইনার টোয়িন লওয়ানি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘আফ্রিকা ম্যাজিক ভিউয়ার্স চয়েস অ্যাওয়ার্ডস’ (AMVCA) অনুষ্ঠানে তিনি এমন এক কীর্তি গড়েছেন, যা পুরো ফ্যাশন দুনিয়াকে চমকে দিয়েছে। রিয়েলিটি তারকা কুইন মেরি আটাং-এর জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন ৫০০টিরও বেশি আসল পাউরুটি দিয়ে তৈরি একটি অবিশ্বাস্য গাউন! পাউরুটি-ভরা সেই অনন্য পোশাকে আটাং যখন রেড কার্পেটে পা রাখেন, মুহূর্তের মধ্যে সেই ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
যেভাবে তৈরি হলো ৫০০ রুটির গাউন
লাগোস-ভিত্তিক ‘তিয়ান্নাহস প্লেস এম্পায়ার’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) লওয়ানি নিজেকে একজন “উদ্ভাবনী ডিজাইনার” হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। তিনি মূলত একটি নতুন ব্র্যান্ডের পরিচিতি বাড়াতে এই চমকপ্রদ পোশাকটি তৈরি করেন। লওয়ানি জানান, মূল পরিকল্পনা ছিল ৩৫০টি পাউরুটি ব্যবহার করার। কিন্তু কাজ শুরু করার পর দেখা যায় কার্বোহাইড্রেটের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে শেষ মুহূর্তে আরও ১৫০টি পাউরুটি যোগ করতে হয়।
সম্পূর্ণ শেষ মুহূর্তে তৈরি এই পোশাকটির ভিত্তি (Base) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল ফোম। এরপর ময়দা, পানি ও আঠা মিশিয়ে তার ওপর রঙ দিয়ে নিখুঁত টেক্সচার ফুটিয়ে তোলা হয়। পাউরুটিগুলোর আসল রূপ যেন নষ্ট না হয় এবং সেগুলো যেন শক্তভাবে যথাস্থানে আটকে থাকে, সেজন্য পুরো পোশাকের উপরিভাগ রেজিন (Resin) দিয়ে সিল করে দেওয়া হয়েছিল। তবে এই ভারী পোশাক তারকা আটাংকে পরানো এবং অনুষ্ঠানস্থলে অক্ষত অবস্থায় নিয়ে যাওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উদ্দেশ্য ছিল অভিনব বিপণন
লওয়ানি মূলত এই গাউনটির মাধ্যমে একটি বিনির্মাণমূলক শিল্পের প্রয়াস চালাতে চেয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, রেড কার্পেটে মানুষ আটাং-এর কাছে আসবে, পোশাক থেকে পাউরুটি ছিঁড়ে তুলে নেবে এবং তার নতুন বেকারি ব্র্যান্ড ‘সুইটব্রেড’-এর নাম চিৎকার করে বলবে। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তাকর্মীরা এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনায় রাজি না হওয়ায় দর্শনার্থীদের কাছে পোশাকটি শেষ পর্যন্ত একটি অসম্পূর্ণ শিল্পকর্মের মতো মনে হয়েছে। তবে পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল না হলেও, ‘বিগ ব্রাদার নাইজা’র প্রাক্তন প্রতিযোগী আটাং-এর এই পোশাকের মাধ্যমে তাদের বেকারি ব্র্যান্ডটি রাতারাতি বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বিপুল অর্থ খরচ না করে এটিই ছিল লওয়ানির সেরা বিপণন বা মার্কেটিং পরিকল্পনা।
ফ্যাশনে রুটির ইতিহাস নতুন নয়
ফ্যাশন দুনিয়ায় রুটি বা পাউরুটির এমন ব্যবহার কিন্তু একেবারেই নতুন নয়। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার গ্রামীণ নারীরা ময়দা ও পশুর খাদ্যের বস্তা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পোশাক সেলাই করতেন। আবার ১৯১২ সালের ঐতিহাসিক “ব্রেড অ্যান্ড রোজেস স্ট্রাইক”-এর নামটিও জড়িয়ে আছে বস্ত্রকর্মীদের অধিকার আন্দোলনের সাথে। আধুনিক ফ্যাশনেও এর ছোঁয়া লেগেছে; ২০২৩ সালে মিলান ফ্যাশন উইকে বিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘ফেন্ডি’ তাদের রানওয়েতে ব্যাগেট-আকৃতির (ফরাসি রুটি) অ্যাক্সেসরিজ এনেছিল। এমনকি বিখ্যাত পরাবাস্তববাদী শিল্পী সালভাদর দালির শিল্পকর্ম “রেট্রোস্পেক্টিভ বাস্ট অফ এ ওম্যান”-এ একজন নারীর মাথায় ব্যাগেট ভাস্কর্যের মুকুট দেখা যায়।
সঙ্গীতশিল্পী ‘স্পাইস’ থেকে শুরু করে নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ ‘শ্যান্টি টাউন’-এর কলাকুশলীদের স্টাইল করা লওয়ানি বিশ্বাস করেন, নাইজেরিয়া এখন ফ্যাশনের সাথে শিল্পের এই সাহসী সংমিশ্রণকে মন থেকে স্বাগত জানাচ্ছে। সমস্ত জল্পনা-কল্পনার ঊর্ধ্বে গিয়ে ৫০০ পাউরুটির এই গাউনটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, মানুষের সৃজনশীলতার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা গণ্ডি নেই।
সূত্র: ডাব্লিউ ডাব্লিউ ডি