
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রম করলেও রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসনের পুরোনো মানসিকতায় কোনো ইতিবাচক বদল আসেনি বলে আক্ষেপের সুরে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগে যেভাবে ঘুষ গ্রহণ করত, এখনো একইভাবে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার ফন্দি আঁটছে এবং যেকোনো ভালো উদ্যোগকে ভেস্তে দেওয়ার অপচেষ্টা বহাল রেখেছে। এমনকি রাতারাতি ভোল পরিবর্তন করে অনেকেই এখন ‘জুলাই যোদ্ধা’ সাজছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে মির্জা ফখরুল এসব ঝাঁজালো কথা বলেন।
রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডস্থ তথ্য ভবন মিলনায়তনে এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে তথ্য অধিদপ্তরের বিশেষ প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচনের পাশাপাশি এক চিত্রপ্রদর্শনীর শুভ উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রারম্ভেই জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ উৎসর্গকারী বীর শহীদদের স্মৃতিতে এক মিনিট গভীর নীরবতা পালন এবং দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মহান আত্মত্যাগ সত্ত্বেও প্রশাসনিক স্তরে প্রত্যাশিত আমূল পরিবর্তন না আসায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করে বর্ষীয়ান এই রাজনৈতিক নেতা বলেন, এই কথাগুলো আক্ষেপে বলছি। আক্ষেপে বলছি এ জন্য, আমার বয়স অনেক। আমি তো সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না আমাদের মধ্যে। পুরোনো আমলাতান্ত্রিক চর্চা এখনো বহাল রয়েছে জানিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধু সরকার কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধান আসবে না, দেশের সর্বস্তরের জনগণের চিন্তা ও মানসিকতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে; তা না হলে রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের সার্বিক সাফল্য অর্জিত হবে না।
চারপাশে সীমাহীন অসন্তোষ ও হতাশার পরিবেশ থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন আশা দেখতে পাচ্ছেন বলে জানান বিএনপি মহাসচিব। মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি আশাবাদী এ কারণে যে তিনি পরিবর্তন দেখছেন একজন মানুষের মধ্যে, তিনি তারেক রহমান। তিনি চেষ্টা করছেন। তিনি নতুন নতুন নজির স্থাপন করছেন। সেই নজিরকে যদি সবাই মিলে সামনে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে হয়তোবা পরিবর্তনটা হবে। সে জন্য সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন দেওয়া দরকার।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টেনে মন্ত্রী মির্জা ফখরুল উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও উত্তরণ মূলত ধারাবাহিক পরিবর্তনের গল্প। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২৪-এর রক্তঝরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়েই এ দেশের আপামর জনতাকে বুকের তাজা রক্ত ঢালতে হয়েছে। তরুণ সমাজের সাহসী নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জুলাই অভ্যুত্থানটি শুরুতে একটি নির্দিষ্ট সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দাবিতে রূপ নেয়। সেই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে বহু তরুণ তাজা প্রাণ হারিয়েছে এবং তাদের পরিবার এখনো সেই শোকের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। এই সব ত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন রাষ্ট্র কাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করা যাবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক পরিবর্তনের যে নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে তা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ সফল করতে সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা জরুরি।
বক্তব্যের শেষাংশে মির্জা ফখরুল একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, মেধাভিত্তিক ও তরুণদের উপযোগী আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের সুনির্দিষ্ট আহ্বান জানান। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন, জুলাইয়ের বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান প্রদর্শন তখনই হবে, যখন মানুষের আত্মত্যাগকে মর্যাদা দিয়ে একটি কল্যাণকামী ও পরিবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যাবে।