
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে উত্তাল সাগরে মাছ ধরার ট্রলারের পাখা ভেঙে চার দিন ধরে আটকা পড়ে আছেন ১৮ জেলে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের সোনারচরের দক্ষিণে রূপারচর সংলগ্ন সাগরে বিকল অবস্থায় ভাসছে মাছ ধরার ট্রলার এফবি তাওসীন।
ট্রলারটিতে মালিকসহ মোট ১৮ জন মাঝিমাল্লা রয়েছেন। এরই মধ্যে সাগরে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত চলছে। ফলে উত্তাল সমুদ্রে আটকে পড়া জেলেদের উদ্ধারে অভিযান চালানোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বুধবার বিকাল ৫টার দিকে প্রতিবেদনটি পাঠানোর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিকল ট্রলারটির মাঝিমাল্লাদের তখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মাছ ধরতে গিয়ে বিকল ট্রলার
ট্রলারের মালিক হানিফ মাঝি ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি নিজেও ওই ট্রলারে অবস্থান করছেন। মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
হানিফ মাঝি জানান, চরফ্যাশন উপজেলার সামরাজ ঘাট থেকে তারা সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। শনিবার মাছ ধরার পরদিন রোববার ট্রলারের শেপের পাতা ভেঙে যায়। এরপর থেকে সোনারচর ও রূপারচরের মধ্যবর্তী এলাকায় নোঙর করে অবস্থান করছেন তারা।
বুধবার দুপুরে নিজের অবস্থার কথা জানিয়ে হানিফ মাঝি বলেন, ‘আমাদের অবস্থা খুব খারাপ এখন।’
নেটওয়ার্ক ফিরে পাওয়ার পর ৯৯৯-এ খবর
ট্রলারটি বিকল হওয়ার পর রোববার থেকেই মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে ছিলেন জেলেরা। ভাসতে ভাসতে রূপারচরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়।
এরপর ট্রলারের মালিক হানিফ মাঝি তার নিজ এলাকার হাজারীগঞ্জের জোবায়ের এন্টারপ্রাইজের মৎস্য আড়তদার ফরহাদ হোসেন পাটোয়ারীকে বিষয়টি জানান।
পরে ফরহাদ হোসেনের ছেলে জোনায়েদ আল সাকি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে সাগরে আটকে থাকা জেলেদের উদ্ধারে সহায়তা চান।
জোনায়েদ আল সাকি বলেন, মঙ্গলবার ৯৯৯-এ ফোন করার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছে। তবে বুধবার পর্যন্ত জেলেদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মৎস্য আড়তদার ফরহাদ হোসেন পাটোয়ারী জানান, ৯৯৯-এ কল করার পর নৌপুলিশ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু বড় বোট না থাকায় নৌপুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি।
বুধবার বিকাল ৩টা ৩৩ মিনিটে ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এখন ট্রলার পাঠানোর ব্যবস্থা করতেছি। ট্রলারে তেল ভরছি। তাদের উদ্ধারে আমাদের ট্রলার যাবে।’
তবে সাগরের বৈরী পরিস্থিতিতে বোট পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, বিকল ট্রলারে থাকা জেলেদের এখনো খাবারের সংকট দেখা দেয়নি।
লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে শুরু হয়নি উদ্ধার অভিযান
রাঙ্গাবালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইলিয়াছ হোসেন মুন্সি জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
তবে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় তারা এখনো উদ্ধার অভিযান চালাতে পারেনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
নৌপুলিশের দায়িত্বাধীন এলাকার বাইরে ট্রলার
রাঙ্গাবালী নৌপুলিশের ইনচার্জ মোহাম্মদ যায়েদ বলেন, বিকল ট্রলারটি তাদের দায়িত্ব এলাকার বাইরে সাগরে অবস্থান করছে। এ কারণে নৌপুলিশের বোট দিয়ে সেখানে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই।
তিনি জানান, নৌপুলিশের সদস্যরা নদীতে দায়িত্ব পালন করেন। ট্রলারটির বিষয়টি কোস্টগার্ড ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে।
উত্তাল সাগর, তিন নম্বর সতর্ক সংকেত
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান জানান, মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে তারা ট্রলারটির বিষয়ে জানতে পারেন। এরপর থানা, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড এবং মৎস্যজীবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেলেদের উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় সাগর উত্তাল। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সক্ষমতা ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ট্রলারটির সঠিক অবস্থান জানা গেলে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা আরও সহজ হতো।
তিনি আরও বলেন, ওই ট্রলারে থাকা জেলেদের যেন কোনো ধরনের ক্ষতি না হয় এবং যত দ্রুত সম্ভব তাদের উদ্ধার করা যায়, সে জন্য চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।