
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং জনসংখ্যার কাঠামোগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। ইটানগর রাজধানী অঞ্চলে প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র ও অনুমতি ছাড়া গড়ে ওঠা ১৫টি মসজিদ সাইট সম্পূর্ণ সিলগালা করে দিয়েছে বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকার। স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের তীব্র আপত্তি এবং ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে রাজ্য প্রশাসন এই বড় ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
‘অরুণাচল প্রদেশ ইন্ডিজেনাস ইয়ুথ অর্গানাইজেশন’ (এপিআইওয়াইও) নামের একটি স্থানীয় আদিবাসী যুব সংগঠনের ব্যানারে এই অননুমোদিত ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ ও অনুপ্রবেশ বন্ধের দাবিতে আন্দোলন চলছিল। শুক্রবার (৫ জুন) ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করেছে।
এর আগে নিজেদের দাবি আদায়ে আদিবাসী যুব সংগঠনটি রাজধানী অঞ্চলে ২৪ ঘণ্টার একটি প্রতীকী হরতাল বা বন্ধ পালন করেছিল। একই সঙ্গে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তীতে আরও বড় ধরনের গণআন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছিল তারা।
উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে রাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ও শিক্ষামন্ত্রী পিডি সোনা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এপিআইওয়াইও প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডুর এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বিষয়টি প্রথম সরকারের নজরে আসে। তিনি বলেন, "ওই বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জেলা প্রশাসনকে রাজধানী কমপ্লেক্স এলাকায় প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া নির্মিত সমস্ত ধর্মীয় স্থাপনা খুঁজে বের করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেন এবং একটি সরকারি জরিপের মাধ্যমে ১৫টি অননুমোদিত মসজিদের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়।"
শিক্ষামন্ত্রী পিডি সোনা আরও জানান, জেলা কর্তৃপক্ষ সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রথমে ১২টি অননুমোদিত মসজিদ সিলগালা ও খালি করে দেয়। পরবর্তীতে গত ১ জুন মুখ্যমন্ত্রী ও আদিবাসী নেতাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আরেকটি জরুরি ফলোআপ বৈঠকে বাকি ৩টি মসজিদের বিষয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেগুলো সিলগালা করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, আন্দোলনকারী সংগঠনের মূল দাবিগুলো ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে, তাই জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে তারা নতুন কোনো হরতাল বা আন্দোলনের ডাক দেওয়া থেকে বিরত থাকবে বলে প্রশাসন আশা প্রকাশ করছে।
মূলত এই ঘটনাটি অরুণাচল প্রদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ, জনসংখ্যার দ্রুত পরিবর্তন এবং স্থানীয় আদিবাসী উপজাতীয় সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে নতুন করে একটি বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজ্য কর্মকর্তারা স্পষ্ট স্বীকার করেছেন যে, অরুণাচল প্রদেশের উন্মুক্ত আন্তঃরাজ্য এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলো অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ এবং এর জন্য ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন।
এর আগে মে মাসে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডুর সভাপতিত্বে ছাত্র সংগঠন, উপজাতীয় সমাজ, নাগরিক সমাজ, আইনি বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের পরামর্শমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে স্থানীয় আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং রাজ্যে প্রবেশাধিকারের বিশেষ ব্যবস্থা বা ইনার লাইন পারমিট (আইএলপি) ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, "এই চ্যালেঞ্জটি কেবল অরুণাচল প্রদেশের একার নয়, এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত একটি বড় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।"
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে অংশীজনদের দাবি মেনে ইনার লাইন পারমিট বা আইএলপি ব্যবস্থা পরিচালনা, তদারকি ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সম্পূর্ণ আলাদা ও ডেডিকেটেড সরকারি বিভাগ গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকেই অরুণাচল প্রদেশের উপজাতীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের মূল অগ্রাধিকার।