
অর্থকষ্টের তীব্র কষাঘাতও দমাতে পারেনি আলিরেজা বেইরানভান্দকে। চরম দারিদ্র্যের কারণে শৈশবেই ঘর ছেড়েছিলেন যাযাবর পরিবারের এই সন্তান; পারিবারিক মায়ার চেয়েও পেটের তীব্র ক্ষুধা যাকে আগে লড়তে শিখিয়েছে। কখনো গাড়ি ধুয়েছেন, কখনোবা টেনেছেন ভারী পাথর—আর সেই অবিরাম কঠোর পরিশ্রমেই ইস্পাতকঠিন হয়ে উঠেছে তার শরীর ও মন। অভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করা সেই অদম্য শক্তির প্রমাণ তিনি এবার রাখলেন বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হয়েছিল ইরান। শক্তির বিচারে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে থাকা বেলজিয়ানদের বিপক্ষে ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র করে মাঠ ছাড়ে ইরান। আর এই লড়াইয়ের অবিকল্প নায়ক হয়ে উঠেছেন দলটির গোলরক্ষক বেইরানভান্দ। পুরো ম্যাচে বেলজিয়ামের একের পর এক আক্রমণ একাই প্রতিহত করে রক্ষণভাগ আগলে রাখেন তিনি। দুর্দান্ত এই পারফরম্যান্সের সুবাদে ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছে তার হাতে।
যাযাবর জীবন থেকে তেহরানের রাজপথ: এক রূপকথার গল্প
ফুটবল মাঠের মতোই বেইরানভান্দের বাস্তব জীবনটাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ আর লড়াইয়ে ভরা। ইরানের লোরেস্তান অঞ্চলের এক হতদরিদ্র যাযাবর পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারের শৈশব কেটেছে চরম প্রতিকূলতায়। পরিবার ফুটবল খেলার বিরোধী হওয়ায় এবং তীব্র অর্থকষ্টের কারণে কিশোর বয়সেই স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে ঘর ছেড়ে রাজধানী তেহরানে পাড়ি জমান তিনি।
তেহরানে এসেও শুরুতে তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। দিনের পর দিন বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের সামনে ফুটপাতে রাত কাটিয়েছেন। বেঁচে থাকার তাগিদে গাড়ি পরিষ্কার করা কিংবা কারখানায় শ্রমিকের কাজ করার মতো কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। তবে শৈশবে পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী পাথর ছুড়ে খেলার যে অভ্যাস ছিল, সেটিই তার শারীরিক শক্তিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়, যা পরবর্তীতে গোলপোস্টের নিচে বল রুখে দিতে তাকে অবিশ্বাস্য সুবিধা এনে দেয়।
নকআউটের স্বপ্ন দেখছে ইরান
আজ বেইরানভান্দ শুধু ইরানের গোলপোস্টেরই অতন্দ্র প্রহরী নন, বরং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম এক অনুপ্রেরণার নাম। দীর্ঘদিনের অনাহার, অভাব আর সীমাহীন সংগ্রাম পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে তার এই বুক চিতিয়ে লড়াই তাকে ফুটবল বিশ্বে আলাদা এক মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে ইরানের এই ড্র কেবল একটি মূল্যবান পয়েন্ট এনে দেয়নি, বরং পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বেইরানভান্দের এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে ইরান এখনো বিশ্বকাপে ভালোভাবেই টিকে রয়েছে। গ্রুপ পর্বের পরবর্তী ম্যাচে মিশরকেও যদি বেইরানভান্দ একইভাবে রুখে দিতে পারেন, তবে নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত হয়ে যাবে ইরানের।