
‘মদ ব্যবসা হালাল। সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে মদ বিক্রি করলে সেটা হারাম হয় না। এছাড়া মদ একটি মেডিসিন। মানুষ মেডিসিন হিসেবে মদ খায়’— এমন বক্তব্য দেওয়া এক স্বঘোষিত নিরক্ষর ব্যবসায়ী হতে যাচ্ছেন ইসলামী ভাবধারার আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড ইসলামি ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের পরবর্তী চেয়ারম্যান। সম্প্রতি সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাবিবুর রহমানকে ঘিরে আলোচিত এ ব্যাংকটি নিজেদের সম্পূর্ণ শরীয়াহ মোতাবেক পরিচালিত বলে দাবি করে।
একই ব্যক্তি ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজেকে ‘নিরক্ষর’ বলে দাবি করেছেন। সেই ব্যক্তিই এখন তৃতীয় প্রজন্মের একটি সম্ভাবনাময় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার পথে, যেখানে দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট, কুয়েটসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক কর্মকর্তারা কর্মরত রয়েছেন।
অমিত সম্ভাবনা নিয়ে ১৯৯৯ সালের ৩ জুন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে প্রচলিত ধারার ব্যাংকিং থেকে সরে এসে ২০২০ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। অতীতে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুদকের অভিযুক্ত সাবেক এমডি হাবিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গত ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির ৪২৯তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় চেয়ারম্যান পদে একজন ‘মদ বিক্রেতা’কে সুপারিশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে আস্থাশীল গ্রাহকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্র (এনওসি) পেতে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে, যা এখনো বিবেচনাধীন রয়েছে।
সূত্র জানায়, ওই সভায় চেয়ারম্যান হিসেবে ফিরোজুর রহমান ওলিওর নাম সুপারিশ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মদ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং তার নিয়ন্ত্রণে ঢাকায় তিনটি মদের বার রয়েছে। পাশাপাশি তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই ব্যবসায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সুলতানপুর ইউনিয়ন পরিষদের পাঁচবারের চেয়ারম্যান।
ফিরোজুর রহমান ওলিওর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি শতকোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি দখল করে সেখানে হোটেল নির্মাণ করেছেন। শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর তিনি আত্মগোপনে গেলেও তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।
রাজধানীর ধানমন্ডির পান্থপথ এলাকায় সরকারি জমি দখল করে চারতলা ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই ভবনেই ছিল আলোচিত আবাসিক হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল, যেখানে একসময় জঙ্গি অবস্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরণে একটি কক্ষের দেয়াল উড়ে যায়।
গত বছরের জুনে ঢাকা জেলা প্রশাসন ওলিওর দখলে থাকা ওই চারতলা ভবন ও জমি উদ্ধার করে। মহানগর জরিপ অনুযায়ী, সম্পত্তিটি ১ নম্বর খাস খতিয়ানে বাংলাদেশ সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত। ২০২৪ সালের ১৩ জুন শুক্রাবাদ মৌজার ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ জমি ও ভবন উদ্ধার করা হয়, যার মূল্য সে সময় প্রায় ৮০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, পরে ‘দখলমুক্ত’ ব্যানার সরিয়ে ফেলা হয় এবং ভবনটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম আবারও তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়া ফিরোজুর রহমান ওলিওর মালিকানায় রয়েছে মদের বারসংবলিত হোটেল গোল্ডেন ড্রাগন, হোটেল পিকক এবং হোটেল এরাম।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ফিরোজুর রহমান ওলিও ঢাকাওয়াচকে বলেন, ‘আমার রেস্টুরেন্ট বিজনেস আছে। সেখানে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে মদ বিক্রি হয়। এছাড়া আমি ১০ বছর হইছে আমি নাই, ছাইড়া দিসি। এমপি ইলেকশন করতে গেলে থাকা যায় না, আমি ছাইড়া দিছি। কী কইবো, মানুষের ইজ্জত... ইজ্জত নষ্ট হবে কি, এই ব্যবসা কইরাই তো এইগুলা, আমি ব্যাংক করছি, এই ব্যবসা কইরাই তো। আমি ভাইস চেয়ারম্যান ছিলাম, দোষ নাই; এখন চেয়ারম্যান হইলে দোষ?’
তবে অভিযোগ রয়েছে, তার তিনটি বারের ব্যবসাই এখনো চালু রয়েছে। এছাড়া ‘মদ হালাল’ মন্তব্যের প্রতিবাদে তার এলাকায় ধর্মপ্রাণ মুসলিম ও ওলামা সংগঠন মানববন্ধনও করেছিল, যা সে সময় জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়।
শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়ে তিনি ঢাকাওয়াচকে বলেন, ‘না হইলে না, না হইলে বাদ দিয়া দিবো। কী করবার আছে কন... আপনারা জিগাইয়েন লোকটার দোষটা কী?’
নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ঢাকাওয়াচকে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো কিচ্ছু নাই, আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা নাই। আমি এমপি ইলেকশনে এমপি হয়ে গেছিলাম, আমারে দিলো না, না দিয়া পাপের ভাগে পরছি... আমি লায়ন্সের গভর্নর হইছি, আমার কোনো লেখাপড়া নাই। আমি তো বলি নাই আমি ডিগ্রিধারী।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমারে শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল পর্যন্ত... একজন মুরুব্বি আমার পায়ে পইরা সালাম করছে... আপনারা চিনেন, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে একটা স্কুলে আমি পঁয়ত্রিশ বছর চেয়ারম্যান।’
অসংখ্য ডিগ্রিধারী কর্মকর্তা তার অধীনে কাজ করবেন— এমন প্রশ্নের জবাবে ফিরোজুর রহমান ঢাকাওয়াচকে বলেন, ‘আমি তো চাই না। যারা আমারে চেয়ারম্যান বানাইছে, হইলে হইবো, নাইলে নাই। আমি তো কই নাই আমারে চেয়ারম্যান বানাও... এটা আল্লাহর হুকুম, এটা কপাল। সরকারি বার থাকলে অটোমেটিক বাদ হইয়া যাইবো।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির এক পরিচালক ঢাকাওয়াচকে বলেন, ‘ওই সভায় সব পরিচালক উপস্থিত ছিলেন না। বিতর্কিত এই ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে সুপারিশ করায় দুইজন পরিচালক ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে সভা ত্যাগ করেন। উপস্থিত পরিচালকদের একটি অংশের মাধ্যমে চেয়ারম্যান পদে সুপারিশ গৃহীত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সুপারিশটি ব্যাংক কোম্পানি আইন, ইসলামিক ব্যাংক কোম্পানির প্রস্তাবিত বিধান, বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট গভর্ন্যান্স নির্দেশনা এবং বোর্ডের কার্যবিবরণীর আলোকে যথাযথভাবে গৃহীত হয়েছে কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের যাচাই করা প্রয়োজন।’
তার ভাষ্য, ‘পর্ষদে সুশিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও সুনামের অধিকারী অন্যান্য পরিচালক থাকা সত্ত্বেও কী বিবেচনায় এমন একজন ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে, যিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতিনিধি হয়ে ২৫ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন— বিষয়টি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।’
একই বিষয়ে ব্যাংকটির শরীয়াহ কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাওয়াচকে বলেন, ‘এমন ঘটনা যদি ঘটে থাকে, তা সত্যিই দুঃখজনক। বোর্ডে তো আরও পরিচালক আছেন। তাদের মধ্যে কি আর কেউ চেয়ারম্যান হওয়ার মতো নেই? আমি যতদূর শুনেছি, এই লোকটি নিরক্ষর। একজন নিরক্ষর ব্যক্তি কীভাবে একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন? বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা। এই লোক নির্বাচিত হলে আমি ব্যাংকের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করব।’
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান ঢাকাওয়াচকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক চায় ব্যাংকের বোর্ডের পরিচালকরা নৈতিকতার ঊর্ধ্বে থাকবেন। কারণ তাদের প্রতি আস্থা রেখেই আমানতকারীরা ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন।’