
পূর্ব আফ্রিকার দেশ সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধ ১০০০ দিনে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশটি এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় ও তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়েছে- এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) প্রকাশিত আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাগাতার সংঘর্ষ এবং বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তার তহবিল কমে যাওয়ায় বর্তমানে সুদানে ৩ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটি বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই যুদ্ধ অবসানে এবং জরুরি খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বর্তমানে সুদানের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশের বেশি—প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ—তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। ইসলামিক রিলিফের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উত্তর দারফুরে শিশুদের অপুষ্টির হার বিশ্বের নথিভুক্ত সর্বোচ্চ হারগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, গেদারেফ ও দারফুর অঞ্চলের ৮৩ শতাংশ পরিবারের কাছে পর্যাপ্ত খাবার নেই। যুদ্ধের কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে; প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হাসপাতাল বর্তমানে অকার্যকর। এর ফলে সুদানের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কোনো ধরনের চিকিৎসা সুবিধা ছাড়াই জীবনযাপন করছে। পাশাপাশি নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরে সংক্রামক রোগ এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তার তহবিলে বড় ধরনের কাটছাঁটের ফলে সুদানকে এখন গাজা, ইউক্রেন ও মিয়ানমারের মতো অন্যান্য সংঘাতপীড়িত অঞ্চলের সঙ্গে সীমিত সহায়তার জন্য প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘ গত মাসে ২০২৬ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা তুলে ধরে জানায়, দাতা দেশগুলোর অর্থায়ন কমে যাওয়ায় তারা প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র অর্ধেক অর্থ—২৩ বিলিয়ন ডলার—চেয়ে আবেদন করতে বাধ্য হয়েছে। তহবিলের এই ঘাটতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কয়েক কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর।
ইসলামিক রিলিফ সুদানের জ্যেষ্ঠ প্রোগ্রাম ম্যানেজার আল সাদিক আল নূর পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, “১০০০ দিন ধরে একটি দেশকে চোখের সামনে টুকরো টুকরো হতে দেখা এবং বেসামরিক মানুষদের অনাহারে ও বাস্তুচ্যুত হতে দেখা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
একই সুরে ‘অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার’-এর সুদান পরিচালক সামি গুইসাবি সতর্ক করে বলেন, সুদানের এই বিশাল মানবিক সংকট যেন কোনোভাবেই ‘বিস্মৃত বা অবহেলিত সংকটে’ পরিণত না হয়। উন্নয়ন সংস্থাগুলো একযোগে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে যুদ্ধ বন্ধে এবং মানবিক সহায়তার তহবিল বাড়াতে বিশ্বনেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
সূত্র: আল জাজিরা