
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান, অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। একই সঙ্গে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. শবনম জাহানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদার সই করা এক বিবৃতিতে এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানো হয়।
সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে তীব্র আপত্তি
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৩১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান, অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান ও অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমানকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি অধ্যাপক ড. শবনম জাহানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
সিন্ডিকেটের এসব সিদ্ধান্তকে শিক্ষক সমিতি তীব্রভাবে প্রতিবাদ করেছে।
‘রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্দেশে নয়, ১৯৭৩ সালের আদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়’
শিক্ষক সমিতি বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান। বিভিন্ন মত, পথ, যুক্তি ও দর্শনের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩’-এর ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্দেশে নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের আদেশ অনুযায়ী কোনো তথ্যানুসন্ধান বা তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে অভিযুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়াও প্রয়োজন।
এ ছাড়া অভিযোগকারীদের সঙ্গে সরাসরি বা মুখোমুখি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অভিযুক্তদের অভিযোগ খণ্ডনের সুযোগ দেওয়ার নীতিও অনুসরণ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তের নিয়ম মানা হয়নি, অভিযোগ শিক্ষক সমিতির
শিক্ষক সমিতির দাবি, বর্তমান ও পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোতে এসব নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। কোনো তদন্ত কমিটিতেই অভিযুক্ত শিক্ষক ও অভিযোগকারীদের মুখোমুখি করা, যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া, তথ্যের সত্যতা যাচাই কিংবা তথ্য প্রামাণিকরণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
পাশাপাশি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির সব সদস্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং তাঁদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির ন্যূনতম প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি বলে জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।
সংগঠনটির অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষকদের প্রতিনিধিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়নি। তাঁদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি। এরপরই প্রতিবেদনটি সিন্ডিকেটে জমা দেওয়া হয়েছে।
‘ফরমায়েশি কমিটি’, দাবি শিক্ষক সমিতির
বিবৃতিতে শিক্ষক সমিতি দাবি করেছে, এ ধরনের তদন্ত কমিটি আসলে ‘ফরমায়েশি কমিটি’; এগুলো প্রকৃত তদন্ত কমিটি নয়। সংগঠনটির অভিযোগ, এসব কমিটির প্রতিবেদন আগে থেকেই নির্ধারিত, পূর্বপরিকল্পিত এবং একপাক্ষিক।
শিক্ষক সমিতির ভাষ্য, প্রহসনমূলক ও অস্বচ্ছ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে সিন্ডিকেট একের পর এক শিক্ষককে বরখাস্ত করার যে কৌশল নিয়েছে, তা পূর্ববর্তী কর্তৃপক্ষের চালু করা ‘প্রশাসনিক মবতন্ত্র’-এরই ধারাবাহিকতা।
‘শিক্ষক নিপীড়নের নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হচ্ছে’
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিপীড়নের ‘নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ চালু হচ্ছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।
সংগঠনটি অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিবিহীন তথাকথিত তদন্ত কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ভীতির রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।