
দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের বিপুল ঋণভার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
গভর্নর জানান, সিটি গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংকে মোট প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এ ঋণ ২৯টি ব্যাংকের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কয়েকটি শীর্ষ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, “তাদের ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ আছে ২৯ ব্যাংকে। তিনটি লিডিং ব্যাংকের এমডিকে নিয়ে বসেছিলাম। তাদের বলি সমাধান বের করতে। আমরা সহযোগিতা করবো। ওনারা কিছু সমাধান বের করেছেন। আমার মনে হয় যে আগামী তিন মাসের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়নে গেলে সিটি গ্রুপ হয়তো সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।”
সম্প্রতি ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ থাকা সিটি গ্রুপের উচ্চ ঋণভার এবং তা নিয়ে কয়েকটি ব্যাংকের ঝুঁকির মুখে পড়ার খবর সামনে আসে।
সংবাদ সম্মেলনে আরেক শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপকে দেওয়া বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বৈদেশিক মুদ্রায় উল্লেখযোগ্য আয় না থাকলেও গ্রুপটিকে ৮ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং তা আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, “এখন আমরা স্থিতিশীল অবস্থায় আছি। বিদেশি ঋণ গ্রহণ আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশি কোম্পানিগুলো আগাম অনুমতি ছাড়াই বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিতে পারবে।”
এদিকে সম্প্রতি ছয়টি বেসরকারি ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন চালিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর জানান, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার, ঋণ বিতরণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিচালিত অডিটে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও তথ্য গোপনের প্রমাণ মিলেছে।
তার ভাষায়, “এই ছয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার নিয়ে অডিট করা হয়। সেখানে খুবই অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে। অনেক ঋণের তথ্য গোপন করা হয়। খেলাপিতেও একই অবস্থা। এছাড়া আইটিও অডিট করা হয়।”
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চলমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন গভর্নর। তিনি জানান, ব্যাংকটির পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংকের বিষয়টি এখন ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা-টারার বাইরে চলে গেছে। একটু সময় দেন, ঠিক হয়ে যাবে।”
গভর্নর আরও জানান, ব্যাংকটির তারল্য সংকট মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করলেও উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ব্যাংক খাতে তারল্য প্রবাহ বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার উচ্চ রাখা হলেও উৎপাদনমুখী খাতে অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তার মতে, প্রণোদনাভিত্তিক ঋণ ও সহায়ক সুদহার উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে ভূমিকা রাখবে, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে।