
সরকার পতনের জন্য নয়, জনগণের ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামীকালের লং মার্চ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে ‘আগামীকালকেই’ পতন করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
লং মার্চের প্রস্তুতি সম্পর্কে গোলাম পরওয়ার জানান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি জেলা ও মহানগরে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে কর্মসূচি সম্পন্ন করার প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এতে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। সকাল ৭টায় ঢাকার শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশের পর গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। পথে কয়েকটি স্থানে সংক্ষিপ্ত পথসভা হবে। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে পৌঁছানোর আশা করছে ১১ দল।
পথসভাগুলোতে সময় সাশ্রয়ের কৌশল তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি পথসভা চলার সময় অগ্রবর্তী একটি টিম পরবর্তী স্থানে চলে যাবে। সেখানে তারা বক্তব্য দিয়ে পরের গন্তব্যে এগিয়ে যাবে। পরে মূল শীর্ষ নেতারা সেখানে গিয়ে যোগ দেবেন।
সম্ভাব্য পথসভাগুলোর স্থান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, চিটাগাং রোডের কাচপুর ব্রিজসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ডে প্রথম পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, কুমিল্লার নুরজান হোটেলের সামনে, চৌদ্দগ্রাম, মহিপাল ও মিরসরাইয়ে পথসভা হবে। এরপর গাড়িবহর চট্টগ্রামের লালদীঘির উদ্দেশ্যে রওনা হবে। যানজট বা গাড়ির কারিগরি সমস্যার মতো স্বাভাবিক কোনো ব্যতিক্রম না ঘটলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সেখানে পৌঁছানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
লং মার্চে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেককে ডেলিগেট কার্ড দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। প্রতিটি গাড়ির সামনে ও পেছনে স্টিকার এবং নম্বর থাকবে। শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা, অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক, আইটি ও মেডিকেল বিভাগের গাড়িগুলো নির্ধারিত ক্রমে বহরে থাকবে।
গাড়িবহরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অংশগ্রহণকারীদের পথে গাড়ি থেকে না নামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গোলাম পরওয়ার বলেন, পথসভাগুলোতে স্থানীয় ১১ দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেবেন। তবে গাড়িবহরের ডেলিগেটরা গাড়ির ভেতরেই থাকবেন। কেবল নির্ধারিত নেতারা বক্তব্য দেওয়ার জন্য গাড়ি থেকে নামবেন এবং বক্তব্য শেষে আবার গাড়িতে উঠবেন।
পথে নতুন কোনো গাড়ি বহরে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, ‘এই গাড়িবহরের ভেতরে পথে কেউ ঢুকতে পারবে না। যারা যুক্ত হতে চাইবেন, তাদেরকে একেবারে বহরের লাস্টে এসে যুক্ত হতে হবে।’
তিনি আরও জানান, বহরে মেডিকেল ও কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক দলের গাড়ি এবং আইটি টিম থাকবে। আইটি টিম লং মার্চের সরাসরি সম্প্রচার করবে। পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক এবং অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব মিডিয়া টিমও গাড়িবহরে থাকবে।
চট্টগ্রামে লং মার্চকে ঘিরে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে দাবি করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘লালদীঘির ময়দান ছাপিয়ে গোটা চট্টগ্রাম মহানগরী জনসভায় রূপান্তরিত হবে।’
সরকারের প্রতি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে যে, আপনারা আমাদের এই নতুন সরকারের ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দল সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক এই গণতান্ত্রিক কর্মসূচি, এটা শান্তিপূর্ণ হবে, নিয়মতান্ত্রিক হবে। আপনারা এই কর্মসূচিকে সফল করার ব্যাপারে সকল প্রশাসনিক সহযোগিতা দিয়ে জনগণের আস্থায় থাকবেন।’
তবে লং মার্চে কোনো ধরনের বাধা বা প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকারকে জনরোষের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আল্লাহ না করুন, যদি সরকারি কোনো দল, তার কোনো অঙ্গ বা পার্শ্ব সংগঠন অথবা প্রশাসনের কোনো অংশ যদি আমাদের এই বিশাল লং মার্চের বহরের কোনো প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে এমনিতেই তো জনগণের আস্থা থেকে আপনারা সরে যাচ্ছেন। আপনারা এই জনগণের আস্থাকে তো আরও হারাবেন এবং জনরোষের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’
লং মার্চের মাধ্যমে সরকার পতনের কোনো কর্মসূচি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এই সরকারকে আন্দোলন করে আগামীকালকেই পতন করতে চাই না। উৎখাতের কোনো আন্দোলন আমরা করছি না। জনগণের দাবি হলো- গণভোটের গণরায় মেনে নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা, জনদুর্ভোগ, সার, বিদ্যুৎ, দুর্নীতি ও দলীয়করণসহ ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তো বলিনি যে আপনাদের উৎখাত করে ফেলব। ফলে আপনারা পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি যে সমস্ত দেশে আছে, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি হচ্ছে গণতন্ত্রের একটা চর্চা, একটা সৌন্দর্য।’
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে এখানে বিরোধী দল, সরকারি দলের অন্তত মত-সহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নের যে ব্যাড কালচার আমাদের ছিল, তার থেকে আমরা ফিরতে শুরু করেছি—এই আস্থাটা প্রমাণ করার সুযোগ কিন্তু সরকারের কাছে এসেছে।’
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা এই পর্যন্ত লং মার্চ নিয়ে কোনো নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা আশংকা করছি না। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ আছি। যখন সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকে তখন যারা শয়তান আছে বা অন্যান্য বিশৃঙ্খল আছে তারা ভয় পায়। আশা করি যে যখন সবাই একসাথে যাব সংখ্যাটা বেশি থাকার কারণে তারা ভয় পাবে।’
তিনি আরও বলেন, “দুষ্কৃতিকারীরা এ ধরনের কোনো আর যদি করো এটা সরকার এটার দায়িত্ব বহন করতে হবে। সরকার দেশে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এটা আমরা ধরে নিব। এবং আমরা সরকারকে বলবো আপনার আশেপাশে যে সমস্ত মন্ত্রী আছে উল্টাপাল্টা কথা বলতেছে এদেরকে সামলান।”
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা আশা করব যে, সরকার এটাতে পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে। কোনো যদি বিশৃঙ্খলা হয় বা কোনো হামলা হয়, বিএনপি সরকারকে এই দায়ভার পুরো বহন করতে হবে। যদি এই ধরনের কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, এটার শক্ত জবাব ইনশআল্লাহ দেওয়া হবে।’