
দেশের ব্যাংকিং খাতের একীভূতকরণের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্রান্তিলগ্নে থাকা নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির শীর্ষ পদে আসীন হলেন অভিজ্ঞ ব্যাংকার আবেদুর রহমান সিকদার। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।
ঢাকা পোস্টকে তাঁর এই নতুন কর্মস্থলে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
ডাচ্-বাংলা থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পদে
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার পটভূমি হিসেবে জানা যায়, বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আবেদুর রহমান সিকদারকে এই নতুন ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগের জন্য গত ২৯ জুন (সোমবার) অনাপত্তিপত্র (এনওসি) জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে গত ২৩ জুন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের নীতিনির্ধারণী সভায় তাঁর নাম প্রস্তাব ও অনুমোদন করা হয়েছিল। সমস্ত আইনি ও দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা সফলভাবে শেষ করে আজ তিনি কর্মক্ষেত্রে যোগ দিলেন।
দীর্ঘ সময় ধরে কোনো পূর্ণকালীন ও স্থায়ী এমডি না থাকায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রাত্যহিক ও কৌশলগত নীতি নির্ধারণী কার্যক্রম অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করছেন, নতুন এই দক্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণের ফলে দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি হওয়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের (এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক) সম্পদ, দায়-দেনা, কর্মী বাহিনী এবং প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো একীভূত (মার্জার) করার ঝুলে থাকা প্রক্রিয়াটি এবার দ্রুত গতি পাবে।
বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণের অনুমোদন, ব্যাংক পুনর্গঠনের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, নতুন সাংগঠনিক কাঠামোর রূপরেখা চূড়ান্তকরণ এবং সাধারণ আমানতকারীদের আটকে থাকা অর্থ রিফান্ড করার প্রক্রিয়া আরও বেগবান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংকটের মুখে ৫ ব্যাংকের একীভূতকরণ
উল্লেখ্য, গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে তীব্র আর্থিক বিপর্যয়ে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে উদ্ধার করতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম, ২০২৫’-এর অধীনে এনে এই ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করে সরকার। মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে এই মেগা ব্যাংকটি তার যাত্রা শুরু করে, যার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অংশীদারিত্ব বা জোগান রয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা সাধারণ আমানতকারীদের আমানতের বিপরীতে ব্যাংকের শেয়ারে রূপান্তরিত করা হয়েছে। গত বছরের ৩০ নভেম্বর এই নতুন ব্যাংকটিকে চূড়ান্তভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স বা অনুমোদন দেওয়া হয়।
বর্তমানে নতুন পাশ হওয়া ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর আইনি কাঠামোর অধীনে এসব ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিশেষ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন শাখায় কাজ করা আবেদুর রহমান সিকদারের গতিশীল নেতৃত্ব এই মুহূর্তে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে, চলমান তীব্র তারল্য সংকট মোকাবিলা করতে এবং সাধারণ আমানতকারীদের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যে ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন বা করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কোম্পানি সেক্রেটারি, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) নিয়োগের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটিও একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।