
ব্যক্তিগত আক্রমণ, তীব্র সমালোচনা আর অনবরত বিষোদ্গারের মুখে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে এক দীর্ঘ ও বিস্ফোরক বার্তা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তাকে লক্ষ্য করে ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ও তাদের অনুসারীদের ধারাবাহিক আক্রমণের কড়া জবাব দিয়ে তিনি দাবি করেছেন, তাকে হত্যার পরিবেশ অনেক আগেই তৈরি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ‘সব দোষ মাহফুজ আলমের’ শিরোনামে চলমান তীব্র সমালোচনার প্রত্যুত্তরে এই দীর্ঘ পোস্ট দেন তিনি।
জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির আক্রমণ নিয়ে প্রশ্ন
ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ আলম প্রশ্ন তোলেন, তিনি নিজে কখনো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের কোনো মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন কি না। নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তি মাহফুজের বিরুদ্ধে হওয়া বিষোদগারের ৮০-৯০% ই জুলাইয়ের কথিত পক্ষের লোকদের বিশেষ করে জাশি-এনসিপি-উগ্র ডানদের করা। লীগ আক্রমণের টাইম আর স্পেসই খুঁজে পাচ্ছে না। আর, তথ্য মন্ত্রণালয়ে ৯ মাসের জন্য জন্য আমি দোষী হলে, আগে পরের ৯ মাসের উপদেষ্টারা কেন দায়মুক্ত? তাঁরা যদি সদিচ্চাবান হন, তাইলে মাহফুজ আলম গাদ্দার কেন?
তিনি আরও যোগ করেন, আদর্শিক জায়গা থেকে তিনি অবশ্যই জামায়াত ও উগ্র ডানপন্থীদের রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধিতা করেছেন। তবে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি কেবল একটি নির্দিষ্ট দল নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৭১ কে অস্বীকারের/অবনমনের জাশির রাজনীতি নিয়ে যদি জামায়াতকে প্রশ্ন করা অপরাধ হয়, সে অপরাধে জুলাইয়ের কথিত পক্ষের লিবারেল-বাম-সেকুলারদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ও দায়ী হতে বাধ্য। কিন্তু, সেরকম কিছু কি হয়েছে?
জামায়াত বিতর্ক ও শাহবাগ প্রসঙ্গ
জামায়াতে ইসলামীর সাথে তার আদর্শিক দূরত্বের বিষয়ে মাহফুজ আলম স্পষ্ট জানান, এই বিরোধিতার কারণে যদি তাকে বিভাজন তৈরির জন্য অভিযুক্ত করা হয়, তবে জুলাইয়ের আন্দোলনকে একক কোনো দলের বয়ানে বন্দি হওয়া থেকে বাঁচানোর এই লড়াইয়ে তিনি বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নন। তবে তিনি একই সাথে পরিষ্কার করে দেন যে, তিনি কখনোই শাহবাগের ফ্যাসিবাদী ও জামায়াত-বিদ্বেষী চিন্তাধারাকে সমর্থন করেননি।
সাবেক এই উপদেষ্টা উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, পলিসি বা আদর্শ নিয়ে গঠনমূলক তর্ক না করে বিগত প্রায় দুই বছর ধরে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী তাকে ব্যক্তিগতভাবে নিশানা করে চলেছে।
বিগত কয়েক মাসের পরিস্থিতি নিয়ে মাহফুজ:
"গত একবছর তো জাশি-এনসিপি-উগ্র ডানদের নিয়ে তেমন কোন কোন বক্তব্য ও দিইনি। অন্তরীণ সরকারের আমলে জাশি বিরোধিতার জন্য সরকারের ভিতরে কোনঠাসা করা হয়েছে। আমি নিজের জীবন ও সম্মান বাঁচাতে চুপ করে গেসি। কিন্তু, ব্যক্তি আক্রমণ ও গালিবাজির রাজনীতি কেন থামছে না? আমি গত ৬ মাস কোন দায়িত্বেও নাই, এমপি ও না, নেতাও না। কিন্তু, এ জাশি-এনসিপি-উগ্র ডানের নিশানা কেন ব্যক্তি মাহফুজ বারবার হচ্ছে?"
‘মৃত্যুকামনা ও প্রতীকী জবাই’
নিজের নিরাপত্তা ও তাকে নিয়ে তৈরি হওয়া চরম হিংসাত্মক পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে মাহফুজ আলম পোস্টে লিখেছেন, "শিবিরের বট এবং একটিভিস্টরা বারবার আমার ফাঁসির দাবি তুলছেন। মৃত্যুকামনা করছেন। একবার প্রতীকী জবাইও করেছেন। হত্যাযোগ্য করার লেভেল অনেক আগেই পার করেছেন। এনসিপি- উগ্র ডানেরাও এরকমই বাসনা রাখে বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে।"
সবশেষে তিনি তাকে ‘জুলাই আন্দোলনের ধ্বংসকারী’ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তির খেলনা নয় যে একজন চাইলেই তা ধ্বংস করে দিতে পারবে। বরং এই ধরনের সস্তা প্রচারণা জুলাইয়ের গৌরবকেই ক্ষুণ্ণ করছে। কাদা ছোড়াছুড়ি ও ব্যক্তিগত কুৎসা বাদ দিয়ে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে বিতর্ক করার মাধ্যমে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা।