
বিশ্ববাণিজ্যে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং মার্কিন বাজার সুরক্ষায় এবার আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। শ্রমিকদের জোরপূর্বক শ্রমে খাটানোর শর্ত পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের ওপর শাস্তিমূলক কর বা অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর এক বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ লক্ষ্যে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয় (ইউএসটিআর) ইতিমধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেছে।
বুধবার (৩ জুন) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি প্রকাশ করা হয়।
ইউএসটিআর তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, যেসব রাষ্ট্র বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে আমেরিকার দেওয়া শর্তাবলি পূরণে পিছিয়ে রয়েছে, মূলত তাদের রপ্তানি পণ্যের ওপরই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় বেশ কিছু দেশের ওপর নতুন এই শুল্কের হার সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। তবে ওয়াশিংটনের এমন গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে তা একযোগে প্রত্যাখ্যান করেছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাণিজ্যে বৈষম্যমূলক আচরণের বহুল আলোচিত ‘৩০১ ধারা’র (Section 301) আইনি ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে এই নতুন কর চাপানোর প্রক্রিয়া চলছে।
বাস্তবে এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্ববর্তী জরুরি শুল্ক কাঠামোকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পুনরায় কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছে রয়টার্স। ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের দায়িত্বে এসেই বিভিন্ন দেশের পণ্যে ঢালাও শুল্ক বসিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন ফেডারেল আদালত ট্রাম্পের ওই শুল্ক নীতিকে বেআইনি ও অবৈধ বলে রুলিং জারি করেন।
উক্ত রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, ১৯৭৭ সালের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনকে (IEEPA) ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসন এভাবে ঢালাওভাবে কোনো শুল্ক আরোপ করতে পারে না। আদালতের এই ধাক্কার পর ট্রাম্পের সরকার সেই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করে।
কিন্তু আপিল মামলার চূড়ান্ত রায় আসার আগেই, এবার বিচার বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে নতুন এক আইনি কৌশলে শুল্ক আদায়ের দিকে এগোচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইউএসটিআর-এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী— বাংলাদেশ, কানাডা, ইকুয়েডর, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য রাষ্ট্রসমূহ, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়েতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান এবং যুক্তরাজ্যের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করার কথা বলা হয়েছে।
অন্য দিকে, তালিকায় থাকা এবং তদন্তাধীন বাকি ৪৫টি দেশের ওপর আরও চড়া হারে, অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। এই তালিকার মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, নাইজেরিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো পরাশক্তি ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয়ের প্রধান প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির এক বিবৃতিতে তার দেশের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলো যখন জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্য আমদানির বিষয়টি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, তখন তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তিনি তার বিবৃতিতে আরও যোগ করেন, “এর ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে মার্কিন শ্রমিকদের বিশ্ববাজারে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।”
ইউএসটিআর জানিয়েছে, এই প্রস্তাবিত নতুন শুল্ক এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত সাধারণ মার্কিন নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের মতামত নেওয়া হবে। এরপরের দিন, অর্থাৎ আগামী ৭ জুলাই এই স্পর্শকাতর বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক গণশুনানির দিন নির্ধারণ করেছে মার্কিন প্রশাসন।
সূত্র: রয়টার্স