
শত শত বিধ্বংসী মিসাইল আর ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ড আর সমুদ্র অঞ্চলগুলোতে বিস্ফোরিত হলেও, এই বিস্ফোরণের প্রভাবে কেঁপে কেঁপে উঠছে দক্ষিণ এশিয়ার লাখো পরিবার। প্রাণহানি, অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রবাসী শ্রমিক ও তাদের স্বজনরা।
ইরানের উপসাগরীয় হামলায় নিহতদের বড় একটি অংশ দক্ষিণ এশীয় হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার এক সপ্তাহ পর, ভারতের ওড়িশা রাজ্যের নাইকানিপল্লী গ্রামের জয়া খুন্তিয়া নিয়মমতো ফোনে কথা বলেন দোহায় কর্মরত তার ছেলে কুনার সঙ্গে। ৬ মার্চ রাত প্রায় দশটার সেই কথোপকথনই ছিল শেষ। বাবা স্মরণ করে বলেন, “সে আমাকে বলেছিল, ‘আমি এখানে নিরাপদে আছি, চিন্তা করবেন না’।”
পরদিন কুনার রুমমেট পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তাদের বাসার কাছে ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ ও ধ্বংসাবশেষ পড়ার শব্দে আতঙ্কিত হয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন ২৫ বছর বয়সী এই পাইপ ফিটার। পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। কয়েকদিন পর তার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছায়। আল জাজিরা স্বাধীনভাবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি, তবে তার পরিবার এই সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য দক্ষিণ এশীয় পরিবারের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক হামলায় নিহতদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটজনের মধ্যে পাঁচজনই দক্ষিণ এশীয়—তিনজন পাকিস্তানি এবং একজন করে বাংলাদেশ ও নেপালের নাগরিক। ওমানে নিহত তিনজনই ভারতীয়। সৌদি আরবেও নিহতদের মধ্যে একজন ভারতীয় ও একজন বাংলাদেশি রয়েছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ অভিবাসী শ্রমিক কাজ করছেন, যা ওই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তায়।
খুন্তিয়া পরিবার ২০২৫ সালে দুই মেয়ের বিয়ের জন্য ৩ লাখ রুপি ঋণ নেয়। কুনা দোহায় গিয়ে মাসে প্রায় ১৫ হাজার রুপি করে পাঠিয়ে সেই ঋণ শোধে সহায়তা করছিলেন। তার বাবা বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম আমাদের কষ্টের অবশেষে অবসান হতে চলেছে,” এবং যোগ করেন, “আমার একমাত্র ছেলে বলত, ‘বাবা, চিন্তা করো না, আমি এখানেই আছি।’ ও-ই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা… আমাদের সবকিছু।”

এখন সেই আশার অবসান। জয়ার কণ্ঠে শোক, “ওই একটা ফোনকলই আমাদের শেষ করে দিয়েছে,” এবং “সে কথা দিয়েছিল আমাদের দেনা শোধ করে ফিরে আসবে… কিন্তু ফিরে এল কফিনে করে। এখন আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। একমাত্র ছেলেকে হারানোই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দেনা।”
উপসাগরীয় ছয়টি দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—মোট ৩৫ মিলিয়ন বিদেশি নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে, যা তাদের মোট ৬২ মিলিয়ন জনসংখ্যার বড় অংশ।
এদের মধ্যে ভারত থেকে ৯০ লাখ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে ৫০ লাখ করে, নেপাল থেকে ১২ লাখ এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক রয়েছেন। অধিকাংশই নির্মাণ, তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর ও বন্দর খাতে কাজ করেন—যেগুলো এখন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত পাকিস্তানি শ্রমিক হামজা বলেন, “ঠিক আমাদের চোখের সামনেই একটি সংরক্ষণাগারে ড্রোন হামলা চালায়। আমরা পুরোপুরি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল, এরপর হয়তো আমাদেরই পালা।”
তবে ঝুঁকি জেনেও অনেকের পক্ষে দেশে ফেরা সম্ভব নয়। হামজা বলেন, “আমরা ফিরে যেতে চাই, কিন্তু পারি না,” এবং “আমাদের পরিবার আমাদের ওপর নির্ভরশীল… আমাদের আর কোনো উপায় নেই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য ও সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকরা বাধ্য হয়েই এসব দেশে কাজ করতে যান। সংকটকালে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বছরে প্রায় ১০৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পায়, যা অনেক দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ভারতের অংশ ৫০ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তান ৩৮.৩ বিলিয়ন, বাংলাদেশ ১৩.৫ বিলিয়ন, শ্রীলঙ্কা ৮ বিলিয়ন এবং নেপাল ৫ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে শুধু পরিবার নয়, পুরো অর্থনীতিই চাপের মুখে পড়বে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক নূর জানিয়েছেন, “আমি আর কখনো এখানে ফিরে আসব না,” এবং “এটা খুবই বিপজ্জনক। আমরা রাতে ঘুমাতেও পারি না।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা আমাদের চোখের সামনেই এটা ঘটতে দেখেছি। সেই ভয়টা থেকে যায়… তা কখনো দূর হয় না।” পরিবারের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমার বাচ্চারা যখনই আমাকে ফোন করে, তখনই কাঁদে।”
অর্থনৈতিক কষ্টের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট—“এখানে ক্রমাগত আতঙ্কের মধ্যে থাকার চেয়ে আমি বরং ফিরে গিয়ে আমার পরিবারের সাথে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করব,” এবং “অন্তত সেখানে আমি তাদের সাথে থাকব।”
সুত্র: আল জাজিরা