
রাজধানীর কলতাবাজারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছাত্রীদের একটি মেসে র্যাবের পরিচয় দিয়ে কয়েকজনের প্রবেশ এবং সেখান থেকে এক শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে হস্তক্ষেপ করলে ওই শিক্ষার্থীকে ছাড়াই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেখান থেকে চলে যান বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে কলতাবাজারের জনসন রোডের ৫৩/৪ বি এলাকার একটি ছাত্রী মেসে এ ঘটনা ঘটে।
র্যাব পরিচয়ে মেসে প্রবেশ
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সকালে কয়েকজন ব্যক্তি ওই মেসে গিয়ে নিজেদের র্যাবের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। একটি মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে তারা সেখানে এসেছেন বলে জানান।
একপর্যায়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বর্ষা খাতুনকে একটি র্যাবের গাড়িতে তোলা হয়।
ঘটনাটি জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রক্টরিয়াল টিম দ্রুত সেখানে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতি ছাড়া ওই শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানানো হলে শেষ পর্যন্ত তাকে আর নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ঘটনাস্থলে গিয়ে যা দেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সকালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফোন পেয়ে তিনি মেসটিতে যান। এরপর বিষয়টি সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করেন। পরে পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য, প্রথমে র্যাব পরিচয়ে আসা ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। পরে র্যাবের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের হস্তক্ষেপের পর ওই শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তারা একজন শিক্ষার্থীকে র্যাবের গাড়িতে তোলা অবস্থায় দেখতে পান।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
সহকারী প্রক্টর আরও বলেন, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা থাকলে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইন অনুযায়ী তদন্ত করা হবে। পাশাপাশি পুরো ঘটনার পেছনে কোনো অনিয়ম কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চুরির মামলার কথা জানানো হলেও মেলেনি বিস্তারিত তথ্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. তারেক বিন আতিক জানান, সকালে একজন শিক্ষার্থী ফোন করে তাকে মেসে র্যাব পরিচয়ে কয়েকজনের আসার বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান।
অধ্যাপক তারেকের ভাষ্য অনুযায়ী, মেসে থাকা ব্যক্তিদের কাছে প্রথমে জানতে চাইলে তারা ভুল করে ওই মেসে এসেছেন বলে জানান। পরে তারা চুরির মামলার একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে এসেছেন বলে জানান। এর মধ্যেই একজন শিক্ষার্থীকে র্যাবের গাড়িতে তোলা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে গিয়ে দেখি শিক্ষার্থীকে গাড়িতে ওঠানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বলি, শিক্ষার্থী এখান থেকে যাবে না। শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ থাকলে প্রক্টর অফিস ও উপাচার্য মহোদয়কে জানিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অধ্যাপক তারেক জানান, ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে চুরির মামলার কথা বলা হলেও ঘটনাস্থলে মামলাটির বিস্তারিত তথ্য তাদের জানানো হয়নি।
তার দাবি, শিক্ষার্থীর পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে মামলাটি হয়ে থাকতে পারে।
এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় ও মোবাইল নম্বর জানতে চাওয়া হয়েছিল। তবে তারা পরিচয় বা মোবাইল নম্বর দিতে রাজি হননি বলেও দাবি করেন অধ্যাপক তারেক। তিনি জানান, বিষয়টি সূত্রাপুর থানার পুলিশকে জানানো হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তার দাবি, সেখানে যাওয়া ব্যক্তিরা র্যাবের সদস্য ছিলেন এবং একটি মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে ওই শিক্ষার্থীকে নিয়ে যেতে এসেছিলেন।
ওসি বলেন, পরে তারা জানতে পারেন, মামলাটি পারিবারিক বিরোধের কারণে করা হয়েছে। এরপর ওই শিক্ষার্থীকে আর না নিয়েই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চলে যান।
মামলাটির বিস্তারিত তথ্য জানতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যোগাযোগ করে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। তবে মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন ওসি।
পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি সামনে
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষা খাতুনের বোনের সাবেক স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর বর্ষা খাতুনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে মেসটিতে থাকা অন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত অভিযোগ থাকলে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।