
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইনকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরই মধ্যে রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিবাগত রাতে রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানায় মামলাটি করেন নাজমুল হোসাইন। তিনি রামেবির উপাচার্যের একান্ত সচিব (পিএস) এবং হিসাব শাখার সেকশন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সরকারি কাজে বাধা, লাঞ্ছনা ও মালামাল নেওয়ার অভিযোগ
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার গাজীউর রহমান জানান, রামেবি ক্যাম্পাসে ঢুকে জোরপূর্বক উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করা, সরকারি কাজে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, সরকারি মালামাল নিয়ে যাওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে।
মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর গভীর রাতে নগরীর প্যারামেডিক্যাল এলাকার নিজ বাসা থেকে আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে মামলার অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে উপাচার্যকে অপমান, লাঞ্ছনা এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্যাম্পাসের সামনে মানববন্ধন করেছেন।
একই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনেও সর্বস্তরের চিকিৎসকদের ব্যানারে পৃথক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রামেবির উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি ওঠে।
ক্যাম্পাসে উত্তেজনা, স্থবির দাপ্তরিক কার্যক্রম
উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনার পর থেকে রামেবি ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্যাম্পাসে উপস্থিত হলেও স্বাভাবিকভাবে দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডা. মোফাখখারুল ইসলাম।
মঙ্গলবার দুপুরে অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতার উপাচার্য ঘেরাও’ কর্মসূচি চলার সময় পদত্যাগ করানোর ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
আন্দোলনের একপর্যায়ে উপাচার্যের কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং তাকে অফিস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ সময় উপাচার্যকে রক্ষা করতে গেলে তার একান্ত সচিব নাজমুল হোসাইনকে মারধর ও পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
রামেবির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, উপাচার্য ও তার পিএসকে পদত্যাগ করানোর সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। এর মধ্যে ‘জ্বালোরে জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও, আওয়ামী লীগের আস্তানা’ এবং ‘আওয়ামী লীগের দোসর ভিসি, হুঁশিয়ার সাবধান’—এ ধরনের স্লোগানও ছিল বলে তারা জানান।
অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার দাবি
ঘটনার পর মঙ্গলবার বিকেলে নিজ বাংলোর সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক। সেখানে তিনি দাবি করেন, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা কিছু ব্যক্তি এর আগেও তার পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তারা তার কাছে ঠিকাদারি কাজ চেয়েছিলেন এবং জোর করে তাদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই ব্যক্তিরা হঠাৎ তার কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। তাদের অভিযোগ ছিল, তাদের কাজ না দিয়ে ঢাকার একজন ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এরপর তাকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে লাঞ্ছিত করা হয় এবং তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে জোর করে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে তাকে কার্যালয় থেকে বের করে দিয়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
উপাচার্য বলেন, এভাবে জোর করে কাউকে পদত্যাগ করানো সম্ভব নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তার পক্ষে অফিসে যাওয়ার মতো পরিবেশ নেই। তার একান্ত সচিব নাজমুল হোসাইনকে অবরুদ্ধ রেখে মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া অফিসের সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক এবং কম্পিউটারের সিপিইউ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন উপাচার্য। তার ভাষায়, এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদত্যাগ নয়; বরং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
অন্যদিকে নাজমুল হোসাইন অভিযোগ করেন, আন্দোলনের নামে আসা কয়েকজনের হাতে অস্ত্র ছিল। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। তার দাবি, এটি স্বেচ্ছায় দেওয়া কোনো পদত্যাগপত্র নয়; অস্ত্রের মুখে তাকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে।