
রাজধানীর পল্লবীতে নৃশংসতার শিকার আট বছরের শিশু রামিসার পিতার বুকফাটা হাহাকার ও দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর তীব্র ক্ষোভকে একেবারেই অমূলক নয় বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। সন্তান হারানো এক বাবার এমন অসহায় আক্ষেপের জবাবে প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে অতি দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক রায় কার্যকরের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।
দ্রুত বিচারের অঙ্গীকার
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দেশের সাম্প্রতিক শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, মাগুরার আছিয়া কিংবা ঢাকার রামিসার মতো ঘটনাগুলো আমাদের মানবতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এই ধরনের জঘন্য অপরাধকে কোনোভাবেই বিচারহীন বা আনচ্যালেঞ্জড পার পেতে দেওয়া হবে না।
আছিয়া হত্যা মামলার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, "রামিসার বাবা যে হতাশা ব্যাক্ত করেছেন তার একমাত্র উত্তর হবে যদি আমরা এ বিচার প্রক্রিয়াটাকে প্রত্যাশিত ভাবে অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে করতে পারি। আমরা যদি না করতে পারি তখন ওনার কথা সত্য প্রমাণিত হবে। রামিসার বাবা যেটা বলেছেন, উনার জায়গা থেকে উনি অনুভব করেছেন, সেটা আমি বলবো না যে উনি অমূলক কিছু বলেছেন। আছিয়ার মামলায় সাত দিনের মধ্যে চার্জশিট দিয়েছিলাম, এক মাসে ট্রায়াল শেষ হয়েছিল।"
তিনি আরও যোগ করেন, "বাংলাদেশে বিচার ব্যাবস্থায় যে মামলার জট সে জট নিরসনের জন্য আমরা পদক্ষেপ নেবো। রামিসার বিচারটায় আরেকটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করবো। কোন ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহারের বিবেচনার জায়গা তালিকাই আসবে না।"
এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পেশের নির্দেশ
আইনমন্ত্রী জানান, স্পর্শকাতর এই মামলার গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুততম সময়ে পেপার বুক প্রস্তুত করা উচিত। আছিয়া ও রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত করার লক্ষ্যে যা কিছু করা প্রয়োজন, সরকার তার সবকিছুই করবে। ইতিমধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই মামলার নিখুঁত তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে রায় কার্যকরের বিষয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, "বিচার প্রক্রিয়াকে অতিদ্রুত করতে পারলে রামিসার বাবার প্রশ্নের জবাব দিতে পারব। কার্যকর করা সুপ্রিম কোর্টের হাতে। বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারি না।"
সমাজ ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়ে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন, "রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহার হবে না, আজকে সিদ্ধান্ত হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে এর বিচার হবে। প্রসিকউশন টিম এই মামলা ফাস্ট ট্রাকে নেবে, আশাকরি আদালত সহযোগিতা করবে।"
পল্লবীর সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড
গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার (৮) মস্তকবিহীন দেহ এবং পরবর্তীতে বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই লোমহর্ষক ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের পর পুলিশ প্রথমে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করে। পরবর্তীতে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হলে সে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
নিহত শিশুটির বাবা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে কর্মরত এবং এই পরিবারটি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে পল্লবী এলাকায় বসবাস করে আসছিল। একমাত্র কন্যাসন্তানকে হারিয়ে শোকে মূহ্যমান বাবার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে।
বিচার ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাসহীনতা: বাবার সেই আকুতি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাংবাদিকদের সামনে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ৫৫ বছর বয়সী বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বলেছিলেন, "আমি কিছুই চাই না। কারণ বিচার আপনারা করতে পারবেন না। আপনাদের এই ধরনের কোনো রেকর্ড নাই। আপনারা পারবেন না।"
তিনি আরও বলেছিলেন, "আমার মেয়েও ফিরে আসবে না। আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। আপনারা কোনো এক্সাম্পল দাঁড় করাতে পারবেন? পারবেন না। আমার থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত নেবেন? পারবেন না, আপনারা পারবেন না। এটা বড়জোর ১৫ দিন। তারপর আরেকটা বড় কোনো ঘটনা আসবে। এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। শেষ এটা। আমি দেখতেছি। আমার বয়স ৫৫। কোনো এক্সাম্পল আছে? দিতে পারবেন?"