
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বন্ধে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টায় চীন কেন সহযোগিতা করতে আগ্রহী, তার নেপথ্যে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক অংক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্ক। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বরং নিজের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য রক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই চীন এখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি চায়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সমীকরণ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন বর্তমানে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। বেইজিংয়ের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) প্রকল্পের একটি বিশাল অংশ এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে যদি লোহিত সাগর বা পারস্য উপসাগরের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, তবে তা সরাসরি চীনের অর্থনীতিতে আঘাত হানবে। ফলে ট্রাম্প যদি যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেন, তবে বেইজিং তাকে পূর্ণ সমর্থন দিতে প্রস্তুত।
ট্রাম্পের ‘ডিল’ এবং চীনের ভূমিকা
ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই বড় ধরনের রাজনৈতিক চুক্তিতে বিশ্বাসী। চীনের জন্য এটি একটি সুযোগ। বেইজিং মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান বাণিজ্যিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। তাছাড়া, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর কেবল নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করতে চায় না; তারা বেইজিংকে একটি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক বিকল্প হিসেবে দেখছে। চীন এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যের সমান্তরালে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চায়।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ রক্ষা
চীনের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। গাজা বা লেবানন পরিস্থিতি যদি আরও বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে, যা চীনের শিল্পোৎপাদনের জন্য বড় হুমকি। এছাড়া, সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০' প্রকল্পে চীনের হাজার হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। শান্তি বজায় না থাকলে এই বিনিয়োগগুলো ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই বেইজিংয়ের কাছে যুদ্ধ বন্ধ করা এখন কেবল মানবিক নয়, বরং একটি অপরিহার্য বাণিজ্যিক প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।
ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের বিরল ঐকমত্য
সাধারণত অনেক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান বিপরীতমুখী হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দুই দেশই এখন একই সমান্তরালে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং চীনের ‘অর্থনৈতিক বিস্তার’—উভয় লক্ষ্য অর্জনেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানো জরুরি। চীন আশা করছে, ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে তারা এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারবে যা ওই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনবে এবং তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখবে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
অবশ্য এই পথটি খুব একটা সহজ নয়। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার জটিল সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধগুলো নিরসন করা ট্রাম্প ও শি জিনপিং উভয়ের জন্যই বড় পরীক্ষা। তবে 'মিডল ইস্ট আই'-এর বিশ্লেষণ বলছে, যদি অর্থনৈতিক প্রলোভন এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তবে চীন তার কূটনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে শান্ত রাখতে এবং ট্রাম্পকে একটি বড় ‘ডিল’ সফল করতে সহায়তা করতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর বিশাল বিনিয়োগ এবং নিজেদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখাই মূলত বেইজিংকে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চীনের এই কৌশলগত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিতে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই (Middle East Eye)