
কর্মক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে মেধা ও দক্ষতার পথে কোনো বাধা নয়, তা আবারও প্রমাণিত হলো মালয়েশিয়ায়। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগের (ডিওএসএম) সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, সাধারণ কর্মীদের মতোই সমান তালে এবং সমদক্ষতায় কাজ করতে পারেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা (পিডব্লিউডি)। দেশটির সিংহভাগ নিয়োগকর্তাই এখন প্রতিবন্ধী কর্মীদের কর্মক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন।
জাতীয় বার্তা সংস্থা বারনামার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ শতাংশ নিয়োগকর্তা স্বীকার করেছেন যে প্রতিবন্ধী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের মান অন্যান্য সাধারণ কর্মীদের সমমানের। এছাড়া ৭১ দশমিক ৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের মতে, কর্মক্ষেত্রের সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও নতুন নতুন উদ্ভাবনে এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কর্মীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
পরিসংখ্যানের আলোয় কর্মসংস্থানের চিত্র
জরিপের উপাত্ত অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতির একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠেছে:
বর্তমান অন্তর্ভুক্তি: দেশটির প্রায় ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই তাদের জনশক্তিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্থান দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ আগ্রহ: প্রায় ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা আগামী দিনগুলোতেও প্রতিবন্ধী কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তীব্র আগ্রহ দেখিয়েছেন।
নিয়োগের সংখ্যা: বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কর্মরত আছেন, তার ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশের প্রতিটিতে ১ থেকে ৫ জন করে পিডব্লিউডি কর্মী রয়েছেন। এদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মী কাজ করছেন প্রাথমিক বা সাধারণ স্তরের পেশাগুলোতে।
এই ইতিবাচক ধারা প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধান পরিসংখ্যানবিদ দাতুক সেরি মোহদ উজির মাহিদিন জানান, এই ফলাফল কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে ওঠার পাশাপাশি নিয়োগকর্তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যময় জনশক্তি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, "এই উদ্যোগ শুধু নিয়োগকর্তাদের সচেতনতার প্রতিফলন নয়, বরং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মসংস্থান নিশ্চিত হওয়ার অর্জনেরও প্রতিফলন।"
১ হাজার ৮৩০ জন নিয়োগকর্তার ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, কর্মরত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ৮৬ দশমিক ৫ শতাংশেরই দেশটির সরকার অনুমোদিত অফিশিয়াল প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র রয়েছে। এছাড়া অতীতে যারা প্রতিবন্ধী কর্মী নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাদের ৯১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই ১ থেকে ৫ জন কর্মীর জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন।
নীতিমালার সমর্থন ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
জরিপে অংশ নেওয়া সিংহভাগ নিয়োগকর্তাই কর্মসংস্থানে সমতা নিশ্চিত করার পক্ষে জোরালো মত দিয়েছেন। প্রায় ৯০ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিমালা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন। পাশাপাশি ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন, প্রতিবন্ধকতার ধরন বিচার করে কর্মীদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত।
তবে এই অগ্রগতির সমান্তরালে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের কথাও উঠে এসেছে:
মালয়েশিয়ার কর্মক্ষেত্রে এই ইতিবাচক অগ্রগতির সমান্তরালে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের কথাও উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা জানিয়েছেন যে তারা নির্দিষ্ট পদের জন্য উপযুক্ত যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রতিবন্ধী প্রার্থী খুঁজে পেতে বেশ সমস্যার সম্মুখীন হন। অন্যদিকে, ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের মতে, সাধারণ কর্মক্ষেত্রকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করে গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, তার ব্যয় অনেক বেশি।
এর বাইরে, প্রতিবন্ধী কর্মী নিয়োগের বিপরীতে সরকার যে সমস্ত আর্থিক সুবিধা বা প্রণোদনা দেয়, সে বিষয়েও অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সচেতনতার বড় রকমের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে।
সবশেষে সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে মোহদ উজির মাহিদিন বলেন, "শ্রমবাজারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ আরও জোরদার করতে সরকার, নিয়োগকর্তা, প্রতিবন্ধী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।"
এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।