
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত বিমান হামলার জবাবে পাল্টা আঘাত হানলেও ওয়াশিংটন বা ইসরায়েলি ভূখণ্ডকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু না বানিয়ে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাচ্ছে ইরান। মার্কিন অত্যাধুনিক নৌ-বহর এড়িয়ে তেহরানের কেন এই কৌশলগত পিছু হটা এবং প্রতিবেশীদের বলির পাঠা বানানো—তা নিয়ে চরম চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রাখা এবং একই সাথে নিজের অস্তিত্ব সংকট এড়িয়ে চলাই এই সুচিন্তিত কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।
মার্কিন রণতরীতে হামলা এড়ানোর কৌশল
ইরানের এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা:
ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার আতঙ্ক: লেবানন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সামরিক বিশ্লেষক এলিয়াস হান্না আল-জাজিরাকে বলেন, মার্কিন ওয়াশশিপ বা সামরিক জাহাজে আঘাত হানা ইরানের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন,
‘মার্কিন রণতরীতে হামলা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া।’
পাশাপাশি আমেরিকার যুদ্ধজাহাজগুলো সর্বাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমে সুরক্ষিত থাকায় এগুলোতে সফল হামলা চালানো অত্যন্ত জটিল।
জোটের কৌশল ও অভিযোগ: তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আতিফেহ তাঘিয়ানি দাবি করেন, কুয়েতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে বলে মনে করে তেহরান। যদিও এই আঞ্চলিক দেশগুলো শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাঘিয়ানির মতে, আঞ্চলিক সংঘাত বাড়িয়ে দিয়ে ইরানকে আরও কোণঠাসা করাই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।
'ব্যর্থ কৌশলে আটকে আছে তেহরান'
তেহরানের এই যুক্তিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও 'প্রচারণা' বলে আখ্যা দিয়েছেন কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-শায়জি। তিনি জানান, মার্কিন বিমান হামলার মূল চালিকাশক্তি হলো ইরান উপকূল থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত ‘জ জর্জ ডব্লিউ বুশ’ ও ‘আব্রাহাম লিংকন’ নামের দুটি বিমানবাহী রণতরী।
অধ্যাপক শায়জি জোর দিয়ে বলেন, ইরান ভালো করেই জানে ক্রুজ ও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ওই রণতরীগুলো থেকেই ছোড়া হচ্ছে। কিন্তু একজন মার্কিন সেনার মৃত্যু হলেও যে পরিণতি নেমে আসবে, সেই ভয় থেকেই তেহরান মার্কিন জাহাজে হামলা এড়িয়ে চলছে। তিনি মনে করেন, প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটনকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করার যে পথ ইরান বেছে নিয়েছে, তা একটি ‘ব্যর্থ কৌশল’ এবং এর ফলে তেহরান কেবল আঞ্চলিকভাবে বন্ধুহীন ও একঘরে হয়ে পড়ছে।
সংঘাত ছড়ানোর বড় ঝুঁকি
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বন্দর আল-ওতাইবি মনে করেন, উভয় পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে সতর্কতার সাথে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করছে। এমনকি ইসরায়েলের বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর থেকে মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও ইরান সেখানে সরাসরি আঘাত হানা এড়িয়ে চলেছে।
তবে আল-ওতাইবি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, উপসাগরীয় কোনো দেশে ইরানের হামলায় যদি বড় ধরনের বেসামরিক প্রাণহানি ঘটে, তবে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এছাড়া কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের জন্য বড় রাজনৈতিক দায় হয়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সার্বিকভাবে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ সামাল দিতে এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রাখতেই প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে তেহরান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই সামরিক পদক্ষেপ তেহরানকে কোনো সুবিধা তো দিচ্ছেই না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।