
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক জটিল ও রূপান্তরমূলক অধ্যায়ের মাঝেই দিল্লির সাউথ ব্লকে অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। বাংলাদেশে নিযুক্ত হতে যাওয়া ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার, সীমান্ত সুরক্ষা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর পারস্পরিক সম্পৃক্ততা আরও বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত জনসংযোগ পরিদপ্তর (এডিজিপিআই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বার্তায় এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এক্সের সেই পোস্টে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে ভারতের মনোনীত হাইকমিশনার শ্রী দিনেশ ত্রিবেদী সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। আলোচনায় ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।’
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবেই এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিএএ-এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির মাঝেই ভারতের আসাম রাজ্যের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে ঢাকার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সিএএ এবং এনআরসি সম্পূর্ণভাবে ভারতের ‘আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়।’
সীমান্ত পরিস্থিতি ও ভারতের এই বিতর্কিত আইন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। তবে একই সঙ্গে ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা জোরপূর্বক পুশব্যাকের (ঠেলে পাঠানো) মতো ঘটনা প্রতিহত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা
একই সংবাদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে বর্তমান সরকার সর্বাত্মক আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতাধীন সব নিয়ম মেনে ইতোমধ্যে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। দেশে আইনানুগ উপায়ে তাঁর বিচার নিশ্চিত করতে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ করছে।
স্বার্থভিত্তিক সম্পর্কে রূপান্তরের পথে দুই দেশ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি আঞ্চলিক কূটনীতিতে এক সম্পূর্ণ নতুন ও রূপান্তরমূলক অধ্যায়ের সূচনা করছে। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রই এখন আবেগ বর্জন করে সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎমুখী, বাস্তববাদী ও পেশাদার সম্পর্ক গঠনের পথে হাঁটছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দিল্লির সাথে সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক ও কার্যকর অংশীদারত্বের দিকে নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট চেষ্টা চলছে। নিরাপত্তা উদ্বেগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অঞ্চলের পরিবর্তিত বাস্তবতার কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে একটি জটিল ও সংবেদনশীল পর্যায় অতিক্রম করছে বলেই এই কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।