
মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেট ভাঙতে এবার সরাসরি জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ ‘টেলিগ্রাম’ সাময়িকভাবে বন্ধ করার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। আগামী ২১ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট-আন্ডারগ্র্যাজুয়েট (নিট-ইউজি) পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মূলত এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত মে মাসে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় ব্যাপক প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠলে তা বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ফলে লাখ লাখ পরীক্ষার্থীকে আবারও এই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) জানিয়েছে, অপরাধী চক্র পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে এবং জালিয়াতি চালাতে টেলিগ্রামকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই অ্যাপটির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই সরকারি সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট অধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, স্রেফ একটি যোগাযোগ অ্যাপ বন্ধ করে প্রশ্ন ফাঁসের মতো গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান কখনোই সম্ভব নয়। এতে সাময়িকভাবে অপরাধমূলক তৎপরতা কিছুটা ধামাচাপা পড়লেও মূল সংকটের শিকড় উপড়ানো যাবে না।
এদিকে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারির পরও ভারতের অনেক এলাকায় সাধারণ ব্যবহারকারীরা টেলিগ্রাম ব্যবহার করতে পারছিলেন। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা কীভাবে পুরোপুরি কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে টেলিগ্রাম কর্তৃপক্ষও এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
উল্লেখ্য, গত ৩ মে ভারতের ৫ হাজারের বেশি কেন্দ্রে আয়োজিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। পরীক্ষা শেষ হতেই দেশজুড়ে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হলে কেন্দ্রীয় সরকার পরীক্ষাটি বাতিল ঘোষণা করে। ঘটনার তদন্তভার দেওয়া হয় ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই-এর হাতে। এই জালিয়াতির সাথে জড়িত থাকার অপরাধে ইতিমধ্যেই এক ডজনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এনটিএ সূত্র জানিয়েছে, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ২২ জুন পর্যন্ত টেলিগ্রাম ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। এর পাশাপাশি আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত টেলিগ্রামের ‘মেসেজ-এডিট’ করার সুবিধাও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, প্রশ্ন ফাঁসের ভুয়া প্রমাণ ও গুজব ছড়াতে এই এডিট ফিচারের অপব্যবহার করা হচ্ছিল।
পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থাটির অভিযোগ, টেলিগ্রামের অসংখ্য গোপন চ্যানেল, গ্রুপ ও অসাধু ‘বট’ ব্যবহার করে পরীক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছিল। এমনকি আসন্ন নতুন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ রুপি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও চালিয়েছে চক্রটি। এসব সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (আইফোরসি) সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন চ্যানেল ও গ্রুপগুলো বন্ধ করে দিয়েছে।
এনটিএ অবশ্য স্বীকার করেছে যে, টেলিগ্রাম ব্যক্তিগত, শিক্ষামূলক ও পেশাগত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের এই সাময়িক ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তবে লাখো শিক্ষার্থীর ভাগ্যের সাথে জড়িত এই পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই কঠোর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল বলে তাদের দাবি।
অন্যদিকে ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’ (আইএফএফ) এই সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছে, এই পদক্ষেপ অত্যন্ত অস্বচ্ছ এবং এর কার্যকারিতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। সংগঠনটির মতে, প্রশ্ন ফাঁসের মূল উৎস ও ভেতরের চক্রটিকে চিহ্নিত না করে একটি যোগাযোগমাধ্যম ব্লক করে দিলে কেবল সাধারণ ব্যবহারকারীরাই বলির পাঁঠা হবেন।
আইএফএফ আরও যোগ করেছে যে, নিট পরীক্ষার ঠিক শেষ মুহূর্তের এই চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্বে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী গ্রুপ স্টাডি, লেকচার নোট আদান-প্রদান এবং পড়ালেখা সংক্রান্ত জরুরি আলোচনার জন্য টেলিগ্রামের ওপর নির্ভরশীল। ফলশ্রুতিতে হুট করে অ্যাপটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের মানসিক ও একাডেমিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সংগঠনটির স্পষ্ট দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো সাধারণত শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও চক্রের যোগসাজশেই ঘটে থাকে। তাই ভেতরকার গলদ দূর না করে কেবল টেলিগ্রাম বন্ধ রাখলে এই ধরনের জালিয়াতি কোনোভাবেই রোধ করা যাবে না।