
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে নিজের বক্তব্যের কারণে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ।
শনিবার দুপুরে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি সংসদে দেওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিতা চেয়ে সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটিকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। এ জন্য তিনি দুঃখিত।
তিনি লেখেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতোই। হাসনাতের দাবি, এ বক্তব্যের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ ও সেখানকার আলেম-ওলামাদের ওপর চাপিয়েছেন। একই সঙ্গে এতে বিশ্বের সামনে তাঁদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের কনসার্ট বন্ধের ঘটনা প্রসঙ্গে হাসনাত বলেন, গণমাধ্যমে ঘটনাটি যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি ছিল তার চেয়ে ভিন্ন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে উচ্চ শব্দে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীরা শব্দ কমানোর অনুরোধ করেন। পরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতির অবনতি হয় এবং পুলিশের লাঠিপেটায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
হাসনাতের দাবি, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করে দেয়নি; তারা কেবল শব্দ কমাতে বলেছিল। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে, যা সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নৌকাবাইচের প্রসঙ্গে নিজের তথ্যগত ভুলের কথাও স্বীকার করেছেন হাসনাত। তিনি জানান, ঘটনাস্থল হিসেবে সিলেটের পরিবর্তে ভুল করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম বলেছিলেন। এ ভুলের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তিনি বিব্রত এবং দুঃখিত।
তিনি আরও বলেন, সংসদে মূল ঘটনার বাস্তবতা এবং গণমাধ্যমে সেটি কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা উচিত ছিল। তবে সম্পূরক প্রশ্নের নির্ধারিত সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে সে সুযোগ পাননি।
হাসনাত বলেন, ‘আমি এবং আমার দল, আমরা জুলাইয়ের আদর্শকে ধারণ করি এবং সকল নীতি, সিদ্ধান্ত সেই আদর্শের ওপর নির্ভর করেই নিতে চাই।’
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন এমন একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছে, যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত থাকবে এবং কেউ নিজের মত বা দৃষ্টিভঙ্গি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না। মতের পার্থক্য ও বিতর্ক থাকলেও কাউকে জোর করে কোনো নির্দিষ্ট মত গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না।
তাঁর মতে, জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল একটি ‘common minimum ground’-এর ঐক্যের প্রতীক। এই আদর্শের প্রতি তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন।
হাসনাত আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি অন্যের ওপর অন্যায়ভাবে চাপ প্রয়োগ করে বা নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে সরকারের দায়িত্ব তা প্রতিহত করা এবং সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা। সরকার সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়।
নিজের বক্তব্যের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবার। এখানে মসজিদ, মন্দির, সংগীত, ওয়াজ, মাজার, কনসার্ট, মাহফিল, রথযাত্রা, সিনেমা উৎসব—সবই থাকবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞ আলেমদের আলোচনারও সুযোগ থাকবে। যে যার পছন্দের আয়োজনে অংশ নেবেন এবং অন্যের পছন্দের বিষয়কে সম্মান করবেন।
হাসনাতের ভাষায়, সরকারের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে কেউ অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে। কিন্তু বর্তমানে সরকার সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর ফলে সমতার বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টের শেষ দিকে হাসনাত বলেন, জুলাই ছিল ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণিনির্বিশেষে সবার আন্দোলন। মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান করে একটি সর্বজনীন সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল এর লক্ষ্য। সেই বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।