
মাদকাসক্ত ছেলের বেপরোয়া আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ছেলেকে এক মাসের কারাদণ্ডও দিয়েছিলেন চকরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তবে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সপ্তাহ পেরোতেই সেই ক্ষোভের চরম প্রতিশোধ নিল ছেলে। নিজের জন্মদাতা পিতাকেই ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করার এক লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের চকরিয়ায়।
শুক্রবার (২২ মে) বেলা আড়াইটার দিকে চকরিয়া পৌরসভার মৌলভীরকুম এলাকায় এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়।
নিহত খলিলুর রহমান (৬০) চকরিয়া পৌরসভার মৌলভীরকুম এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন এবং এলাকায় ছোট একটি দোকানে চা-পান বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরপরই পালানোর চেষ্টাকালে স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক ছেলে মিনারুল ইসলামকে (৩০) হাতেনাতে ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে তাকে স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়। খবর পেয়ে চকরিয়া থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত মিনারুলকে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং থানায় নিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জুমার নামাজ শেষ করে খলিলুর রহমান যখন বাড়ি ফিরছিলেন, ঠিক তখনই রাস্তার মাঝে তার পথ আটকে দাঁড়ায় মিনারুল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে একটি ধারালো দা দিয়ে তার বাবার ওপর চড়াও হয় এবং এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। ঘাতক ছেলের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খলিলুর রহমানের বাঁ হাতের কবজি শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বাহুর একটি বড় অংশ প্রায় আলাদা হয়ে পড়ে। রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম অবস্থায় স্থানীয় লোকজন তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান, তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকাবাসী আরও জানান, মিনারুল দীর্ঘ সময় ধরে মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত ছিল। তার লাগামহীন অত্যাচারে পরিবারে কোনো শান্তি ছিল না। ছেলের এমন আচরণে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় মাস দেড়েক আগে তার বাবা-মা বাধ্য হয়ে চকরিয়ার ইউএনও'র কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। ওই অভিযোগ আমলে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত মিনারুলকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। সপ্তাহ-দশদিন আগে সাজাভোগ শেষ করে সে কারাগার থেকে বাড়িতে ফিরে আসে। তাকে জেলে পাঠানোর কারণেই বাবার ওপর তার তীব্র আক্রোশ তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করছেন প্রতিবেশীরা। এমনকি গত বৃহস্পতিবার আদালতেও বাবার সঙ্গে তার তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়েছিল, যা পরে স্থানীয়রা হস্তক্ষেপ করে শান্ত করেন।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, "মাদকাসক্ত মিনারুলরে কর্মকাণ্ডে পরিবার অতিষ্ঠ ছিল। এ কারণে বাবা-মা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকেই মিনারুল তার বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাকে আটক করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।"
পিতার এমন করুণ মৃত্যু এবং ছেলের খুনি হওয়ার এই নারকীয় ঘটনায় পুরো মৌলভীরকুম এলাকায় গভীর শোক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।