
একটিমাত্র বন্য বানরের ক্রমাগত আক্রমণ ও হিংস্র আচরণে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে নাটোর পৌরসভার একটি পুরো মহল্লা। গত তিন মাসে এই খ্যাপা বানরটির আকস্মিক কামড় ও আঁচড়ে নারী, বৃদ্ধ ও শিশুসহ অন্তত ৩২ জন গুরুতর জখম হয়েছেন। এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে এবং নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এবার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দ্বারস্থ হয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
আজ রোববার (৭ জুন) বিকেলে নাটোর পৌরসভার লালবাজার মহল্লার শতাধিক বাসিন্দার পক্ষে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি গণস্বাক্ষরিত লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারী স্থানীয় কুরিয়ার ব্যবসায়ী মো. মিলন আখন্দ জানান, প্রায় তিন মাস আগে অন্য কোনো এলাকা থেকে একটি খ্যাপা বানর এসে লালবাজার মহল্লায় আস্তানা গাড়ে। তিনি বলেন, “ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি বানরটি মহল্লার রাস্তা-ঘাটে বিভিন্ন ঘরবাড়ির ছাদ ও চালের উপর দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রকাশ্যে এসব বাড়ির রান্নাঘর, খাবার টেবিল, খাবর হোটেলসহ বিভিন্ন দোকানে ঢুকে মহল্লাবাসীকে আক্রমণ করে খাবার নিয়ে চলে যায়। এলাকার মানুষকে বাড়িতে থাকার সময় আক্রমণের ভয়ে সারাক্ষণ বাড়িঘরের দরজা দিয়ে অবস্থান করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময়ও বানরের আক্রমণের ভয় পাচ্ছে। এ পর্যন্ত বানরটির আক্রমণে অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন। এক কথায় বানরটির হামলায় এ মহল্লার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।”
বানরটির নৃশংস আক্রমণের শিকার লালবাজারের গৃহবধূ কাকলী রায় (৩০) নিজের ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “প্রায় দুই মাস আগে তিনি বাড়ির পাশের এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ বানরটি লাফ দিয়ে তার হাতে কামড় দেয়। এতে একটি আঙুলের রগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরে অপারেশন করে তার আঙুলের রগ জোড়া দিতে হয়েছে। এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি।”
একই ধরনের ভয়াবহতার মুখোমুখি হওয়া প্রতিবেশী শ্রী সঞ্জয় রায় (২৫) বলেন, “একদিন বানরটি তার ঘরে ঢুকে ফ্রিজ খোলার চেষ্টা করছিল। তিনি দৌড়ে এসে দরজা আটকে দিতে গেলে বানরটি তার হাতের কুনইয়ের নিচে কামড় দিয়ে গর্ত করে ফেলে। এজন্য তাকে হাসপাতালে গিয়ে সাতটা ভ্যাকসিন নিতে হয়েছে।”
মহল্লার প্রবীণ বাসিন্দা কল্যাণী পাল (৬০) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বানরটি তাদের খাবার টেবিল থেকে পাউরুটি নিয়ে পালাচ্ছিল। তিনি বাধা দিলে বানরটি তার হাতে কামড় দেয়। ফলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।”
আরেক বয়োবৃদ্ধা পূর্ণিমা সেন (৭৫) আতঙ্কিত কণ্ঠে বলেন, “বানরটি বাড়িতে ঢুকে তাকেও কামড় দিয়ে গেছে। বানরটি বেশ শক্তিশালী। ওর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেও পারিনি। ওর ভয়ে এখন তিনিসহ এলাকার মানুষ আতঙ্কিত থাকেন।”
স্থানীয় তরুণ জিসান ও নাজমুল ইসলাম জানান, “বানরটির ভয়ে আমরা আর মহল্লার কোনো চায়ের দোকান বা খাবারের দোকানে দাঁড়াতে বসতে পারি না। বাবা-মা তাদের ছেলে মেয়েদের স্কুলে যেতে দিতে ভীষণ ভয় পাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই কষ্টের মধ্যে আছি।”
আক্রান্তদের চিকিৎসার বিষয়ে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের ভ্যাকসিন শাখার দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স পারভিন আক্তার বলেন, “মাঝে মাঝেই বানরের আক্রমণের শিকার হয়ে হাসপাতালে রোগী আসছেন। গত তিন মাসে আমরা এমন ১৫ জনকে ভ্যাকসিন দিয়েছি।” এর বাইরে অনেকে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ফার্মেসি থেকেও ভ্যাকসিন নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
বন্যপ্রাণী বিভাগ দফায় দফায় চেষ্টা করেও এই চতুর ও হিংস্র বানরটিকে বাগে আনতে পারছে না। বনবিভাগের রাজশাহী কার্যালয়ের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “লালবাজারের বানরটি অস্বাভাবিক আচরণ করছে। বারবার চেষ্টা করেও আমরা বানরটিকে ধরতে পারিনি। বিষয়টি নিয়ে কী করা যায়- আমরা বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবছি।”
এ প্রসঙ্গে নাটোর পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক আরিফ হোসেন বলেন, “স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার জেলা প্রশাসনকে অবগত করায় তিনি নিজে ঢাকা ও রাজশাহী থেকে বনবিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নাটোরে ডেকে আনেন। বনবিভাগের লোকজন ম্যানুয়ালি বানরটিকে ধরার চেষ্টা করে সফল হয়নি। আগামী দিনে গুলি বা অচেতন করে বানরটিকে ধরার চেষ্টা করবে বলে বনবিভাগের লোকজন জেলা প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছে।”