
বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় সচল করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে দেশে নতুন করে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আজ শনিবার (২৩ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক নীতি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেন।
তহবিলের উৎস ও সুদের হার
ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজটি দুটি উৎসের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে:
১. বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল: ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব উৎস থেকে ৪১ CORE বা ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করবে।
২. বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন: কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করবে।
উভয় ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের স্বস্তি দিতে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ১৯ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে দেওয়া হবে, যা ব্যাংকগুলো পরবর্তীতে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করবে।
"ব্যাংক খাত থেকে ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়েছে" — গভর্নর
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, "ব্যাংক খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খাতটি থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। ভদ্র ভাষায় এটাকে 'খেলাপি ঋণ' বলা হলেও, আসলে এটি চুরি। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত বা সঠিক কাগজপত্র (প্রোপার ডকুমেন্ট) নেই।"
গভর্নর আরও জানান, চুরির এই টাকাগুলো ইতিমধ্যে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে এবং তা ফেরত আনা বেশ সময়সাপেক্ষ। তবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি বাড়ানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানোই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য।
কোন খাতে কত বরাদ্দ?
সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বন্ধ কলকারখানার পাশাপাশি কৃষি, সিএমএসএমই, রপ্তানি ও পরিবেশবান্ধব খাতে সুনির্দিষ্টভাবে বণ্টন করা হয়েছে।
১. বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল (৪১ হাজার কোটি টাকা) থেকে বরাদ্দ:
বন্ধ শিল্প কারখানা ও সেবা খাত: ২০ CORE বা ২০ হাজার কোটি টাকা।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড: ১০ হাজার কোটি টাকা।
সিএমএসএমই (CMSME) খাত: ৫ হাজার কোটি টাকা।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ: ৩ হাজার কোটি টাকা।
উত্তরবঙ্গকে 'কৃষি হাব' হিসেবে গড়ে তোলা: ৩ হাজার কোটি টাকা।
২. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল (১৯ হাজার কোটি টাকা) থেকে বরাদ্দ:
রপ্তানি খাতের প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট: ৫ হাজার কোটি টাকা।
কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা: ৫ হাজার কোটি টাকা।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং হিমায়িত মাছ রপ্তানি খাত: প্রতিটিতে ২ হাজার কোটি করে মোট ৪ হাজার কোটি টাকা।
বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, গ্রিন বা পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান: প্রতিটিতে ১ হাজার কোটি করে মোট ৪ হাজার কোটি টাকা।
স্টার্টআপ খাত: ৫০০ কোটি টাকা।
সৃজনশীল অর্থনীতি (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি): ৫০০ কোটি টাকা (এই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সিএসআর বা সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতের আওতায় খরচ করবে)।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক তদারকির মাধ্যমে এই প্রণোদনা প্যাকেজটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের শিল্প ও কৃষি খাতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি দ্রুত গতিশীল হয়ে উঠবে।