
ফ্যাসিবাদ যেন দেশে আবারও জায়গা করে নিতে না পারে এবং কেউ যাতে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে, সে লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে অন্যায় ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) আয়োজিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে আলো ফেরানোর মতো মহৎ কাজ আর নেই। ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের প্রতিভা বিকাশে কাজ করছে। তিন বছর আগে এ কার্যক্রমে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদেরও যুক্ত করা হয়েছে। তারাও সমাজের মানুষ এবং তাদেরও অধিকার রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা অন্যদের নিয়ে, যাদের চোখে আলো রয়েছে, তাদের নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকি। কিন্তু যাদের চোখের আলো নিভে গেছে, তাদের ব্যাপারে আমাদের রাষ্ট্রীয় মনোযোগ খুব বেশি নেই। আমরা দেখতে পাই না বলেই আপনাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সামনে এগিয়ে এসেছে।’
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, নীরবে একটি শ্রেণির মানুষকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা এবং তাদের আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিভা বিকাশের এ ধরনের উদ্যোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
এ কাজে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শও দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরও কীভাবে সহায়তা পাওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখা উচিত। মন্ত্রণালয় সরাসরি এ কার্যক্রমের অংশীদার হতে না পারলেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। এ বিষয়ে তিনি নিজে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান।
দেশের মানুষের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, অধিকাংশ মানুষের চোখে আলো থাকলেও দেশ গঠন ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব যাদের, তাদের অনেকে মানুষের অধিকার দেখতে পাচ্ছেন না। আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে তারা মানুষের অধিকার ও অন্যায়-অবিচারের বিষয়গুলো উপেক্ষা করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের মুখে সততা ও মানবিকতার ছাপ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের চোখে আলো থাকলেও তারা মানুষের অধিকার ও অন্যায় দেখতে পান না।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের সময় ২০ দিনে পাখির মতো গুলি করে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে রাস্তায় হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ৩০০ মানুষ হাত হারিয়েছেন, কেউ পা হারিয়েছেন, কেউ মাথা হারিয়েছেন।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থীর মাথার একটি অংশ নেই। এত ঘটনার পরও চোখে আলো থাকা অনেক মানুষ দাবি করছেন, কিছুই ঘটেনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের মতো মুখ আছে, কিন্তু মানুষের মুখোশ পরে রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারের নামে মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কারও ভাই, কারও বোন, কারও মা, কারও স্বামী এখনো নিখোঁজ। অথচ তাদের চোখে আলো রয়েছে।’
ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা যে যেখানে থাকুন, চোখ খুলুন। আমরা যদি অপরাধ করি, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিন। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি আপনাদের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।’
নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশকে বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দায়িত্ব পালনে ভুল হতে পারে উল্লেখ করে সেই ভুল সংশোধন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
জন্মভূমির প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও ভালোবাসার কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘জননী এবং জন্মভূমির থেকে আপন কিছু নয়। কখনো কখনো জন্মভূমি জননীর থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায়।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এমন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগোতে হবে, যেখানে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিশ্চিত থাকবে। ফ্যাসিবাদ যাতে পুনরায় পুনর্বাসিত হতে না পারে এবং কেউ যেন ফ্যাসিস্টে পরিণত না হয়, সে জন্য একটি রোডম্যাপ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়। যারা ফ্যাসিস্টদের খুন-খারাপি দেখছেন না, তাদের বলব আপনারা চোখ খুলুন। আল্লাহ প্রদত্ত দুটি চোখ খুলুন। তা যদি না পারেন, অন্তর চক্ষু খুলুন। তাহলে দেখতে পাবেন।’
দেশ গঠনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, একসঙ্গে হাঁটি, একসঙ্গে চলি। দেশ গড়ার কাজে আমরা মনোনিবেশ করি।’
আয়োজকেরা জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক বিভাগে শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, হামদ, নাতে রাসুল (সা.) ও রচনা প্রতিযোগিতায় তারা অংশগ্রহণ করেন। এবারের প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল— ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা’।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ, ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সভাপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম নুরউদ্দিন খান, ইরান দূতাবাসের প্রথম কাউন্সেলর এসরাফিল আমিরি গোর্জাদ্দিনি, ঢাকা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান এরশাদ ফয়েজ এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হক।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।