
ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কলেজ শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান মাসুম (২৫) হত্যার ঘটনায় বড় অগ্রগতি এসেছে। মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত পলাতক ১৭০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ফেনী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হাসান এ আদেশ দেন। চার্জশিটে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম রয়েছে।
আদালত ও পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার এক দফা দাবির অসহযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন মাসুম। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ৪ সেপ্টেম্বর নিহতের ভাই মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে ফেনী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১৬২ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করা হয়।
২০২৫ সালের ৩১ জুলাই নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান মামলার চার্জশিট দাখিলের তথ্য জানান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনী মডেল থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন বলেন, এজাহারভুক্ত ১২ জন ও সন্দেহভাজন ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মুরাদ হাসান বাবুসহ তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত শেষে ১৫৬ জন নামীয় এবং অজ্ঞাত ৬৫ জনসহ মোট ২২১ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, পলাতক ১৭০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এর মধ্যে চারজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের বিচার শিশু আদালতে হবে।
ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন মামুন বলেন, মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২২ জানুয়ারি। তিনি জানান, সাড়ে পাঁচ মাস পর বুধবার আদালত চার্জশিট গ্রহণ করেন। এর আগে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ও ১৩ নভেম্বর চার্জশিট গ্রহণ ও পর্যালোচনার দিন ধার্য থাকলেও তা হয়নি।
এই মামলায় উল্লেখযোগ্য পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী, ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল, দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগ সভাপতি দিদারুল কবির রতন, পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র নিজাম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সাজেল, সোনাগাজী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, যুবলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম পিটু ও জিয়া উদ্দিন বাবলু।
নিহত মাসুম সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের তরাব পাটোয়ারী বাড়ির বাসিন্দা। তিনি মৃত মাওলানা নোমান হাসানের ছেলে এবং ছাগলনাইয়া আব্দুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন।
মামলার বাদী ও নিহতের ভাই মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বলেন, “আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাই। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মহিপালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের করা গুলি মাসুমের মাথায় লাগে। সহপাঠীরা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তিন দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে আমার ভাই না ফেরার দেশে চলে যায়।”
উল্লেখ্য, গত ৪ আগস্ট মহিপালে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় এ পর্যন্ত ২৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা এবং ১৭টি হত্যাচেষ্টা ও সহিংসতার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে।