
চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় বহু সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় একাই প্রাণ হারান ১৫ জন পুলিশ সদস্য। এছাড়া ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনরোষের আশঙ্কায় পুলিশের একটি বড় অংশ দায়িত্বস্থল ত্যাগ করলে বহু থানা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এ সময় ফাঁকা থানায় লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। ছাত্র-জনতার হত্যাকাণ্ড নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করলেও পুলিশ সদস্যদের হত্যার বিষয়টি দীর্ঘদিন অগ্রাধিকার পায়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত থমকে যাওয়ার কারণ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, গণআন্দোলনের সময় রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের ফৌজদারি দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা একটি অধ্যাদেশ তদন্ত কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ের গেজেটের মাধ্যমে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়।তবে পুলিশের দাবি, যেকোনো হত্যাকাণ্ডেরই পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
কোথায় কতজন নিহত
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী—
সিরাজগঞ্জ (এনায়েতপুর থানা): ১৫ জন
ঢাকা মহানগর ও আশুলিয়া: ১৯ জন
গাজীপুর: ১ জন
কুমিল্লার তিতাস থানা: ২ জন
চাঁদপুর (কচুয়া): ১ জন
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি: ২ জন
কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশ: ১ জন
হবিগঞ্জ (বানিয়াচং): ১ জন
নারায়ণগঞ্জ পিবিআই: ১ জন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ১ জন
সরকারি পর্যায়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর তদন্তে ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়ায় এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নতুন করে শুরু বা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মামলা কম, নিহত বেশি
পুলিশ হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে—
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) যাত্রাবাড়ী থানায় ৩টি
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কোতোয়ালি থানায় ২টি
অথচ নিহত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ৪৪ জন। রাজনৈতিক চাপ, সাক্ষীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতার কারণে তদন্ত ব্যাহত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিভিন্ন ইউনিট হামলার আগে ও পরের ভিডিও ফুটেজ ও আলামত সংরক্ষণ করেছে।
পাল্টা মামলা ও তদন্ত পরিস্থিতি
অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পুলিশ সদস্য আসামি রয়েছেন ১ হাজার ১৬৮ জন, যার মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৬১২টি।
বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ৬৮টি মামলা তদন্ত করছে। এসব মামলায় ৯৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা আসামি।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশ হত্যার তদন্ত বিষয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেগুলোর তদন্ত চলছে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন,“পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।”তিনি আরও বলেন, প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি সময়মতো জানানো হবে।