
৩০ মার্চ ইসরায়েলি ভূমি দখলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। ১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ গ্যালিলি অঞ্চলে ২,০০০ হেক্টর জমি বাজেয়াপ্ত করার প্রতিবাদে ৬ ফিলিস্তিনি শহীদ হন। এই দিনটি ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমির অধিকার ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হয়। এ বছর এমন সময় এই ভূমি দিবস পালন করা হচ্ছে যখন ফিলিস্তিনিরা নিজেদের অধিকাংশ ভূমি হারিয়ে ফেলেছে। এসব ভূমি অধিগ্রহন করেছে দখলদার ইসরায়েলিরা।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনের দক্ষিণে নিজের জমিতে বহু বছর আগে লাগানো জলপাই গাছ কেটে ফেলতে বাধ্য হওয়া ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল রহমান আজ্জামের অভিজ্ঞতা এই সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটি অবৈধ বসতির জন্য সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে জমি বাজেয়াপ্তের সিদ্ধান্তের পর তিনি নিজেই গাছগুলো কেটে ফেলেন।
গত ডিসেম্বরে বাজেয়াপ্তের জন্য নির্ধারিত জমির পরিমাণ ছিল ৫১৩ ডুনামের বেশি (৫১.৩ হেক্টর), যার মধ্যে ৪৫০ ডুনাম আল-ফানদাকুমিয়া গ্রামের এবং বাকি অংশ সিলাত আদ-ধাহর ও আল-আত্তারা এলাকার অন্তর্ভুক্ত।

এ বছর ভূমি দিবস পালিত হলেও বাস্তবতা বদলায়নি। বিশেষ করে ‘এরিয়া সি’-তে বসতি সম্প্রসারণ, জমি দখল এবং প্রবেশে বাধা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলি নেতারা এই দখল পরিকল্পনাকে কার্যত সম্পন্ন বলে দাবি করে আসছেন।
ভূমি দিবস ১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চের ঘটনাকে স্মরণ করে, যখন গ্যালিলি অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ফিলিস্তিনি জমি বাজেয়াপ্তের ঘোষণা দেয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়, যা দমন করতে গিয়ে ছয়জন নিহত ও শতাধিক আহত ও গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকেই দিনটি ফিলিস্তিনিদের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক।
দুই দফায় হারানো জমি
শৈশব থেকেই পরিবারসহ জমিতে কাজ করে আসা আজ্জাম ২০০২ সাল পর্যন্ত চাষাবাদ চালিয়ে যান। তবে ওই বছর তারসালা বসতি ও সানুর সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পর তিনি জমিতে প্রবেশাধিকার হারান। ২০০৫ সালে সেনা প্রত্যাহারের পর আবার জমিতে ফিরলেও সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে পুনরায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
“হঠাৎ আমরা সরকারি সংবাদপত্রে জমির নম্বর এবং হোমেশ ও তারসালা বসতি সংযোগকারী একটি রাস্তা নির্মাণের জন্য বাজেয়াপ্ত করার একটি আদেশ দেখতে পেলাম। ২০০৫ সালের প্রত্যাহারের পর বসতি স্থাপনকারীরা ওই বসতিগুলোতে ফিরে গিয়েছিল। আমরা দেখলাম, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই বুলডোজার দিয়ে জমিটি ভাঙা শুরু করে দিয়েছে,” আজ্জাম আল জাজিরাকে বলেন।
নিজের গাছ সেনাবাহিনীর হাতে নষ্ট হতে না দিতে তিনি নিজেই তা কেটে ফেলেন। “সেনাবাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের চেয়ে আমাদের নিজেদেরই এগুলো কেটে ফেলা সহজ। এটা আমাদের ভূমি, এবং আমাদের গাছগুলো আমাদের সন্তানের মতো; আমরা তাদের লালন-পালন করি ও যত্ন নিই, কারণ আমরা কঠোর পরিশ্রম করে তাদের চাষ করেছি ও পরিচর্যা করেছি,” তিনি আরও বলেন।
দখলের বহুমাত্রিক কৌশল
১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীর ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিন ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে ‘সি’ এলাকা, যা মোট ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ, সম্পূর্ণ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এই এলাকায় জমি বাজেয়াপ্তের হার বেড়েছে বলে অভিযোগ ফিলিস্তিনিদের। তাদের মতে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই সংযুক্তিকরণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৯৪টি সামরিক আদেশে ৫,৫৭২ ডুনাম জমি দখল করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ঘোষণার মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। বসতি সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা সড়ক নির্মাণ ও ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
একই সময়ে পূর্বে বাজেয়াপ্ত ১৬,৭৩৩ ডুনাম জমি বসতি স্থাপনকারীদের পশুচারণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জেরুজালেম, নাবলুস, রামাল্লা, বেথলেহেম ও কালকিলিয়ায় প্রায় ৫৫,০০০ ডুনাম জমি দখলের তথ্যও উঠে এসেছে।

সরাসরি উচ্ছেদ ও সহিংসতা
জমি দখলের পাশাপাশি সহিংসতা ও উচ্ছেদ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। রামাল্লার পূর্বে আল-মুঘাইয়ির এলাকার বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী কুসাই আবু নাইম জানান, বসতি স্থাপনকারীদের হামলার মুখে ফেব্রুয়ারিতে পুরো সম্প্রদায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
“এই ঘটনাটি ছিল শেষ সীমা। হামলা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ছিল বলে আমরা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। হাসপাতাল থেকে বাড়িঘর ভাঙতে ফিরে আমরা এটা দেখে হতবাক হয়ে যাই যে, বসতি স্থাপনকারীরা সেগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ভেতরের জিনিসপত্র তছনছ করে দিয়েছে,” তিনি বলেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলায় নারী ও শিশুরাও রেহাই পায়নি, এমনকি চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি
মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় ৯৭টি এলাকা থেকে অন্তত ৪,৭৬৫ জন ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এদের বেশিরভাগই ‘সি’ এলাকার বেদুইন ও পশুপালক জনগোষ্ঠীর সদস্য।
শুধু চলতি বছরের শুরুতেই জর্ডান উপত্যকার রাস আইন আল-আউজা গ্রাম থেকে ৬০০ জনকে স্থানচ্যুত হতে হয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি বেদুইন বসবাস করেন। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী দশকগুলোতে তারা একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং এখনো সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
ভূমি দিবস তাই শুধু একটি স্মরণ নয়—বরং দখল, প্রতিরোধ ও টিকে থাকার এক চলমান ইতিহাসের প্রতিফলন।
সূত্র: আল জাজিরা