
জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাঊদ আলীকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে রাজধানীতেই অবস্থান করতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সফর চলাকালে রাষ্ট্রদূতকে টোকিওর বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সফরের কূটনৈতিক কার্যক্রম তদারক এবং সার্বিক প্রস্তুতির সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক বিষয়ক সচিব এম নজরুল ইসলামকে জাপানে পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ১৯ অক্টোবর বিকেলে নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'রাষ্ট্রদূতকে তলব বা প্রত্যাহার সংক্রান্ত আদেশে সই হয় ১৫ অক্টোবর। তাকে দুই দিনের মধ্যে ঢাকায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রদূতকে ঢাকাতেই অবস্থান করতে হবে,'
কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম ইতিমধ্যে জাপানে পৌঁছেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের পুরো সময় তিনি টোকিওতে থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনা করতেই দাঊদ আলীকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়েছিল। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরামর্শের জন্য তাঁকে দেশে আনা হলেও সফরের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে যুক্ত রাখা হয়নি।
দাঊদ আলী ১৫তম বিসিএসের পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা। জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হওয়ার আগে তিনি রোমানিয়ায় একই দায়িত্ব পালন করেছেন। চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর তাঁর অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা রয়েছে।
ঘোষিত সফরসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান। আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণেই এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। এসব ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে কাজ করছে উভয় পক্ষ। সফর চলাকালে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করা এবং অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য সফরটিকে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতায় গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ ও বিক্রির সুযোগ বাড়ানো, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরের অংশ হিসেবে ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর খসড়া সফরসূচিতে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টিও রয়েছে।
এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাকাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রধানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
জ্বালানি ও শিল্প খাতের বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনের সম্ভাবনাও রয়েছে তাঁর সফরসূচিতে। এর মধ্যে রয়েছে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, একটি পারমাণবিক কেন্দ্র এবং নাগোয়ায় টয়োটার উৎপাদন কারখানা।
অবকাঠামো ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা
মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ির মতো বড় অবকাঠামো ও পরিবহন প্রকল্পে সহায়তার মধ্য দিয়ে জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মাধ্যমে চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা, নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং অর্থনীতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাইরেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি-স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে এশিয়াজুড়ে জ্বালানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল বাংলাদেশ।
সূত্র: ডেইলি স্টার