
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উসকানি, গুজব ও সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেছেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে, তবে বর্তমানে তাদের সেই সক্ষমতা নেই।
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর এফডিসিতে ‘সহিংসতা বৃদ্ধিতে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার’ শীর্ষক ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২৩ জুন দলটি সংগঠিত হয়ে বড় ধরনের গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারবে—এমন শক্তি এখনো তাদের অর্জিত হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে দিল্লির ইমিগ্রেশনে যে আচরণ করা হয়েছে, তা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো বাংলাদেশকেই অবমাননার প্রচেষ্টা। তিনি ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয় বলে অভিহিত করেন।
প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার ও উসকানি অব্যাহত রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও সমালোচনা করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, বর্তমানে একশ্রেণির মানুষ অত্যন্ত অরুচিকর, নোংরা ও নিম্নমানের ভাষা ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক দলগুলোরও গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণা রোধে দায়বদ্ধতা রয়েছে। তার মতে, এসব অপপ্রচার চলতে থাকলে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো আবারও পুনরুত্থানের সুযোগ খুঁজে পেতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়তে থাকা ডিজিটাল আসক্তিকে তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন এবং এটিকে তরুণ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর প্রবণতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ যাতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একটি গোষ্ঠী মুহূর্তের মধ্যে মিথ্যা তথ্য, বানোয়াট খবর ও গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে। ধর্মীয় ও জাতিগত অনুভূতিকে উসকে দিয়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিকৃত তথ্য, সম্পাদিত ছবি ও ভুয়া প্রচারণার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধ বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে।
তার মতে, এসব উসকানিমূলক পোস্টের কারণে গণপিটুনি, ভাঙচুর, রক্তপাত ও প্রাণহানির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে দেশের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
কিরণ আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া ও আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে ব্যক্তি সম্মানহানি ও সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতাও বাড়ছে। রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী কিংবা সুশীল সমাজের প্রতিনিধি—কেউই এ অপপ্রচার থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।
ডিজিটাল আসক্তিকে মাদকাসক্তির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, এটি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে ক্ষতিকর নয়, বরং এর অপব্যবহারই তরুণদের ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। পরিবার, ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত সচেতনতা ও নজরদারি বাড়ানো গেলে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহারের কারণে সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে’ শীর্ষক ছায়া সংসদ বিতর্কে সরকারি দল হিসেবে অংশ নেওয়া প্রেসিডেন্সী ইউনিভার্সিটি বিজয়ী হয়। তারা বিরোধী দল তেজগাঁও কলেজকে পরাজিত করে।
প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ রইস, সাংবাদিক মাছুদুর রহমান, সাংবাদিক মিরাজ মাহবুব ইফতি, সাংবাদিক মো. আতিকুর রহমান এবং সাংবাদিক জাফর ইকবাল।
বিতর্ক শেষে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র বিতরণ করা হয়। পুরো আয়োজনের দায়িত্বে ছিল ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি।