
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অপরাধীদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আগের মতো ভয় কাজ করছে না। একই সঙ্গে পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও কমেছে বলে মনে করছেন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এই পরিস্থিতির সুযোগে বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে, যা সরকারের ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পুলিশের সঙ্গে জনগণের আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠন করা না গেলে পরিস্থিতিতে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের মর্নিং মিটিংয়ে এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রয়োজনে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় অপরাধীদের ডিটেনশনে নেওয়ার প্রস্তাবও দেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোরতার পাশাপাশি বাহিনীকে সুসংগঠিত করার তাগিদ
সভায় কর্মকর্তারা বলেন, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অনেকে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে দ্রুত জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। এতে অপরাধ দমনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়ানো, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে পুরো বাহিনীকে আরও সুসংগঠিত করা এবং অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সভায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাদকের বিস্তার ঠেকাতে একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ আসে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে পুলিশিং কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নত করার ওপর জোর দেন কর্মকর্তারা।
পুলিশের গোপনীয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। এতে পুলিশের সব অতিরিক্ত আইজিপি, বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান, ডিআইজি (ক্রাইম), ডিআইজি (প্রশাসন) এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অংশ নেন।
সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মতে, পুলিশের কাজ শুধু কতটি ছিনতাই, ডাকাতি বা হত্যাকাণ্ড ঘটল কিংবা কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো—এ ধরনের পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে জনগণের আস্থা ফিরবে না। পুলিশ বর্তমানে কোন অবস্থানে রয়েছে এবং বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে জনগণকে সর্বোচ্চ কী ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব, সেটিও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।
তাদের মতে, পুলিশের প্রতি মানুষের ভুল ধারণা ও অসন্তোষ কমাতে সরাসরি জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। পুলিশের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধও বাড়বে।
বাহিনীর ভেতরের দ্বিধা কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কথা
একজন অতিরিক্ত আইজিপি সভায় বলেন, প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার সদস্যের বিশাল পুলিশ বাহিনীর মধ্যে বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন, অডিও-ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ সদস্যদের মনোবলেও প্রভাব ফেলছে।
তার মতে, এই অবস্থায় বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করে পুরো সংগঠনকে সুসংগঠিত করা জরুরি। একদিনের উদ্যোগে পুলিশের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এর জন্য ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কার্যকর পরিবর্তন আনতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি নীতিগত পর্যায়েও সংস্কার দরকার।
সভায় সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত অপরাধের ঘটনাও পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে ছিল রাড্ডা ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ-ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেন্টারে অতর্কিত হামলা, মোহাম্মদপুরে জমি দখলের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র হামলা, ইসিবি চত্বরের কাছে দক্ষিণ মানিকদীর নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর, আদাবরে আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টা, ২৫ মামলার আসামি কথিত শীর্ষ মাদক কারবারি ‘পিচ্চি রাজা’র প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া, চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সংঘর্ষ, কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনা, মিরপুরে চলন্ত যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ এবং জমি দখলকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহ ও নাটোরে সংঘর্ষের মতো ঘটনা।
এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা, আইনগত সীমাবদ্ধতা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
জামিন, ডিটেনশন ও মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপের প্রস্তাব
বৈঠকে রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমানের বক্তব্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিচারপ্রক্রিয়ার কিছু নির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আসামিরা সহজে জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হলে আসামির জামিনের অধিকার তৈরি হয়। আবার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮০ দিন এবং সেশন কোর্টে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকলেও নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে তা শেষ করা সম্ভব হয় না। ফলে ওই সুযোগে আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে ‘ক্রসফায়ার’ না থাকায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় অপরাধীদের ডিটেনশনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম।
তবে এ বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশপ্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান বলেন, ঢালাওভাবে কাউকে আটক না করে অপরাধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। এরপর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ডিটেনশনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে পুলিশের প্রত্যক্ষ কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তাবও দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অধিকাংশ অপরাধের পেছনে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং পুলিশও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে কাজ করে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সভায় বলেন, দেশে মাদক কেনাবেচা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তার মতে, অনেক অপরাধের সঙ্গে মাদকের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
অপরাধ দমনে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ফারুক আহমেদ। নৌপুলিশের অতিরিক্ত আইজি প্রধান করিম বলেন, পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠালেও তারা অল্প সময়ের মধ্যে জামিন পেয়ে যাওয়ায় হতাশা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিটেনশনকে কার্যকর একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দেন সিআইডিপ্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন।
মর্নিং মিটিংয়ের পর পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায়ও অংশ নেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। সেখানে তিনি মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
আইজিপি বলেন, অপরাধীর ক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনা করার সুযোগ নেই; অপরাধীর পরিচয়ই তার প্রধান পরিচয়। কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত আইজি সাইদুর রহমান। এতে বিভিন্ন মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশ সদর দপ্তরে ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন পুলিশ প্রধান। সভায় অতিরিক্ত আইজি সাইদুর রহমান কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের যথাযথভাবে শরীরে ধারণযোগ্য ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়।