
টানা অতিবর্ষণ আর পাহাড় বেয়ে নেমে আসা উজানের ঢলে বিপজ্জনকভাবে ফুঁসে উঠছে কাপ্তাই হ্রদ। যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপত্তি এড়াতে এবং অতিরিক্ত পানির চাপ কমিয়ে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাপ্তাই বাঁধের স্প্রিলওয়ের (নির্গমন পথ) ১৬টি জলকপাটই খুলে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান স্বাক্ষরিত এক জরুরি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হ্রদের ধারণক্ষমতা ঠিক রাখতে আগামী শনিবার (১৮ ১৮ জুলাই) বেলা ১১টার পর থেকে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি গেট আংশিক খুলে দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
কপাটের উচ্চতা ও হ্রদের বর্তমান চিত্র
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, কাপ্তাই হ্রদে জমে থাকা পানির চাপের ওপর নির্ভর করে প্রতিটি জলকপাট ৬ ইঞ্চি করে ওপরে তোলা হবে। এতে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক পানি কাপ্তাই হ্রদ থেকে ভাটি অঞ্চলের কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশবে।
বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর প্রায় ১০৪ ফুট বা এমএসএল (মিন সি লেভেল)-এ অবস্থান করছে। যেখানে এই বিশাল জলাধারের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা মাত্র ১০৯ ফুট। পানির মাত্রা বিপদসীমার কাছাকাছি চলে আসায় জানমালের সুরক্ষার্থে পানি ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করা হয়, গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টায় হ্রদের পানির উচ্চতা পরিমাপ করা হয়েছিল ১০৩ দশমিক ৯১ ফুট (এমএসএল)। সম্প্রতি অতিবৃষ্টির ফলে হ্রদে পানির প্রবাহ মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শনিবার বেলা ১১টার পর যেকোনো মুহূর্তে ১৬টি গেটই ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেওয়া হতে পারে।
সচল ৫টি ইউনিট, উপকূলীয় এলাকায় সতর্কবার্তা
বাঁধের স্লুইস গেট খোলার পাশাপাশি বর্তমানে কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি জেনারেটর ইউনিটের সবকটি সচল রয়েছে। এই ইউনিটগুলোর মাধ্যমে পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে প্রতি সেকেন্ডে আরও প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে আছড়ে পড়ছে।
জলকপাটগুলো খুলে দেওয়ার ফলে কর্ণফুলী নদীর দুই কূলের নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আকস্মিক পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নদীর তীরবর্তী বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, মৎস্যজীবী ও সব ধরনের নৌযান চালকদের নিরাপদ দূরত্বে থাকতে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান বলেন:
"হ্রদের পানির উচ্চতা, উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ (ইনফ্লো) এবং বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে স্পিলওয়ে খোলার সময় এগিয়ে বা পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে ইনফ্লো আরও বৃদ্ধি পেলে পর্যায়ক্রমে গেট আরও বেশি খুলে পানি নিষ্কাশনের পরিমাণ বাড়ানো হবে।"
তিনি আরও যোগ করেন:
"বর্তমানে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট চালু রয়েছে। এসব ইউনিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্পিলওয়ে খোলার সম্ভাব্য ঘোষণায় কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"