
কলকাতার ঐতিহাসিক ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের’ নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার। এই নামকরণের পর থেকেই রাজ্যটির রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় ও বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে। পশ্চিমবঙ্গ দিবস (২০ জুন) উপলক্ষে নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বিজেপি।
রোববার (২১ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানান। তিনি মন্তব্য করেন, এটি দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের প্রয়াস। তিনি লেখেন, ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম এখন গোপাল মুখার্জি রোড করা হবে।’
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক এতদিন এমন এক ব্যক্তির নামে ছিল, যিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন এবং রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে নিরীহ মানুষের ওপর সহিংসতার সময় দায়িত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, শুভেন্দু এখানে অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
তবে রাজ্য সরকারের এই দাবিকে তীব্র চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন বিরোধীরা। তাদের দাবি, সড়কটি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে নয়, বরং তার চাচা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসক হাসান সোহরাওয়ার্দীর স্মরণে উৎসর্গ করা হয়েছিল।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্তমান জাতীয় মুখপাত্র সাকেত গোখলে এক্সে স্পষ্ট করে লেখেন, ‘এই সড়কের নাম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে রাখা হয়নি।’
অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী তার পোস্টে দাবি করেন, গোপাল মুখার্জির নামে সড়কটির নতুন নামকরণ করার মাধ্যমে একজন ‘প্রকৃত রক্ষক ও ত্রাণকর্তাকে’ যোগ্য সম্মান দেওয়া হলো, যা ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘এখন থেকে পশ্চিমবঙ্গ প্রকৃত বীরদের স্মরণ করবে, ভুল সংশোধন করবে এবং তাদের সম্মান জানাবে।’
বিজেপির এই যুক্তিকে সমালোচকেরা স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা কুণাল ঘোষও এক্সে এই নাম পরিবর্তন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘আমার মনে হয় কলকাতা পৌর করপোরেশন বড় ধরনের ভুল করেছে।’
দুই সোহরাওয়ার্দীর চাচা-ভাতিজা সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কুণাল ঘোষ বলেন, ‘মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর বিষয়টি যাচাই করা উচিত এবং কলকাতা পৌর করপোরেশনকে নথিপত্র পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া উচিত। যদি ভুলবশত ভাতিজার বদলে চাচাকে শাস্তি দেয়া হয়, তাহলে তা দুর্ভাগ্যজনক হবে।’
নথিপত্র অনুযায়ী, হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের একজন অত্যন্ত কৃতি শিক্ষাবিদ ও খ্যাতনামা চিকিৎসক। তিনি ১৯৩০ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া চিকিৎসা শাস্ত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় মুসলিম হিসেবে ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসের ফেলো হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি।